কোম্পানীগঞ্জের রাজনীতিতে তিন দশকের পথ চলায় জাহিদুর রহমান রাজন
ছাত্ররাজনীতি থেকে যুবদলের নেতৃত্ব-সংগ্রাম, ব্যবসা ও জনসম্পৃক্ততার এক দীর্ঘ পথচলা
নব জ্যোতি ফিচার ডেস্ক:
নদী-নালা, জনপদ আর রাজনৈতিক ইতিহাসে সমৃদ্ধ নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা। সেই জনপদের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায় তিন দশক ধরে সক্রিয় একটি নাম-জাহিদুর রহমান রাজন।
কৈশোরে ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে যে পথচলার সূচনা, সময়ের পরিক্রমায় তা গড়িয়েছে যুবরাজনীতি, ব্যবসা, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয় নেতৃত্বের নানা অধ্যায়ে।
১৯৭৯ সালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের আকবর হাজি বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন জাহিদুর রহমান রাজন।
তাঁর বাবা আব্দুল মন্নান ও মা সেতারা বেগম। পাঁচ ভাই-বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা রাজনের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে কিশোর বয়সেই।
১৯৯৭ সালে বসুরহাট এএইচসি উচ্চ বিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্ররাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি।
পরের বছর, ১৯৯৮ সালে দায়িত্ব পান বসুরহাট পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতির।ছাত্ররাজনীতির সেই সময়টিই তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনের ভিত তৈরি করে বলে জানান তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা।
২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারি মুজিব কলেজ, বর্তমানে কোম্পানীগঞ্জ সরকারি কলেজে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রাজন।
দীর্ঘ সময়ের এই সাংগঠনিক দায়িত্ব তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি কোম্পানীগঞ্জের ছাত্রদল এবং পরবর্তী সময়ে যুবদলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন ও নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের দাবি।
প্রতিকূলতা রাজনৈতিক জীবনের পথটি তাঁর জন্য সবসময় মসৃণ ছিল না। নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে হামলা, মামলা ও কারাবরণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ৬ মাস ১৫ দিন কারাভোগ করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ৪৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার কারণে এখনো তাঁকে আদালতে যেতে হয় বলে জানান তিনি।
এসব রাজনৈতিক ঘটনায় তাঁর ব্যবসায়িক জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি জানান।রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়িকভাবে প্রায় ৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন বলেও তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পাশাপাশি ব্যবসার ক্ষেত্রেও নিজের অবস্থান তৈরির চেষ্টা করেছেন রাজন। মেশিনারিজ ব্যবসা, কোয়ালিটি আইসক্রিম, রুপালী চত্বরের ফ্যাশন গার্মেন্টসের দোকান এবং আরডি মার্কেটের ক্লথ স্টোরসহ বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। তবে তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময়ে এসব ব্যবসার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ব্যবসার পরিধি ও স্থায়িত্ব ধরে রাখতে পারেননি বলেও জানান তিনি।
রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গেও সম্পৃক্ততা রয়েছে রাজনের। তিনি ‘উই ফর ইউ’ সামাজিক সংগঠনের উপদেষ্টা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাষ্ট্রীয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত বসুরহাট ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া জামেয়া ইয়াকুবিয়া মাদরাসার সাধারণ সম্পাদক এবং বসুরহাট কেন্দ্রীয় বড় মসজিদের সদস্য হিসেবেও সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি।
২০২১ সালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা আরও বেগবান হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তাঁকে ওই পদে বক্তব্য দিতে এবং সংগঠনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্মরণীয় ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালে ঢাকার গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন রাজন।
তাঁর আদর্শিক রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি প্রয়াত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে অনুসরণ করেন। মওদুদ আহমদের সঙ্গে কোম্পানীগঞ্জের রাজনৈতিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে স্থানীয় রাজনীতিতেও বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি অংশ হিসেবে উঠে আসে।
রাজনীতির প্রায় তিন দশকের পথচলার পর ভবিষ্যতে জনগণের সমর্থন পেলে বসুরহাট পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন জাহিদুর রহমান রাজন।
তাঁর বক্তব্যে স্থানীয় তরুণ সমাজের কিছু সমসাময়িক সমস্যাও গুরুত্ব পেয়েছে। কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া, ইভটিজিং ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে তিনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কথিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রসঙ্গও তিনি তুলে ধরেন।তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের মূলকথা হিসেবে তিনি যে বাক্যটি সামনে আনেন, তা হলো,“জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন নয়, জনগণের সেবা করাই একমাত্র অঙ্গীকার।
রাজনীতির দীর্ঘ সময়কে ফিরে দেখলে জাহিদুর রহমান রাজনের গল্প কেবল একটি রাজনৈতিক পদ-পদবির তালিকা নয়, বরং এটি স্থানীয় রাজনীতির নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা একজন রাজনৈতিক কর্মীর জীবনচিত্র।
তাঁর দাবি, তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি অসংখ্য নেতা-কর্মী তৈরি করেছেন এবং তাঁদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। কোম্পানীগঞ্জের আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভাকে ঘিরে বিস্তৃত রাজনৈতিক পরিসরে তাঁর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে বলে তাঁর সমর্থকদের দাবি।
একই সঙ্গে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও সহাবস্থান ও পারস্পরিক সম্মানের রাজনীতিতে বিশ্বাসী বলে নিজেকে তুলে ধরেন তিনি।রাজনীতিতে মতের ভিন্নতা থাকবেই। তবে স্থানীয় সমাজে সহাবস্থান, মানুষের পাশে থাকা এবং নাগরিক সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখার প্রশ্নটি সব রাজনৈতিক কর্মীর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
সেই জায়গা থেকেই জাহিদুর রহমান রাজনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাও এখন মানুষের আলোচনায়।
কৈশোরে ছাত্ররাজনীতির হাত ধরে শুরু হওয়া পথচলার বয়স এখন প্রায় তিন দশক।
এই দীর্ঘ সময়ে এসেছে পদ-পদবি, মামলা, কারাবরণ, ব্যবসায়িক ক্ষতি, সামাজিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার নানা অধ্যায়।সামনে তাঁর রাজনৈতিক পথ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটি নির্ধারণ করবে সময়, সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং সর্বোপরি স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ।
তবে নিজের রাজনৈতিক দর্শনের কথা বলতে গিয়ে জাহিদুর রহমান রাজন যে অঙ্গীকারটি সামনে রাখেন, সেটিই তাঁর ভবিষ্যৎ ভাবনার সারকথা-ক্ষমতা নয়, জনগণের সেবা, সম্পদ নয়, মানুষের আস্থা।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment