মুছাপুর ক্লোজার অত্যন্তগুরুত্বপূর্ণ উপকুলীয় অবকাঠামো
মুঃইব্রাহীম খলিল জসিম
নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় নদী ভাঙন রোধ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষি জমি রক্ষায় মুছাপুর ক্লোজার ও রেগুলেটর এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অবকাঠামো।
১. নির্মাণ ইতিহাস
প্রেক্সাপট ও পটভূমি: নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী ফেনীর সোনাগাজী অঞ্চলের বিশাল জনপদ দীর্ঘকাল ধরে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের নোনা জলের প্লাবন এবং তীব্র নদী ভাঙনের মুখোমুখি ছিল। বিশেষ করে বর্ষাকালে ছোট ফেনী নদী ও ডাকাতিয়া নদীর পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতো।
প্রকল্প বাস্তবায়ন: নদী ভাঙন রোধ এবং সমুদ্রের নোনা পানির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (PaWoBo)-এর অধীনে ‘ছোট ফেনী নদী ড্রেজিং ও মুছাপুর ক্লোজার নির্মাণ’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
রেগুলেটর নির্মাণ: এর অধীনে ২৩ ভেন্ট (কপাট) বিশিষ্ট একটি আধুনিক রেগুলেটর এবং ক্রস-ড্যাম বা ক্লোজার বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
কয়েক বছরের কাজের পর ২০১৬ সালের দিকে এর মূল নির্মাণকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয় এবং এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়।
২. ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
নদী ভাঙন প্রতিরোধ: ছোট ফেনী নদী ও মেঘনার মোহনায় নির্মিত এই ক্লোজারটির কারণে কোম্পানীগঞ্জ ও সোনাগাজীর বিস্তীর্ণ উপকূলীয় সীমানা নদী ভাঙন থেকে সুরক্ষা পায়।
কৃষি ও লোনা পানি নিয়ন্ত্রণ: জোয়ারের সময় সমুদ্রের লোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে ফসলি জমি নষ্ট করা রোধ করে। মিষ্টি পানির আধার গড়ে তোলায় আশপাশের হাজার হাজার একর জমিতে আমন ও বোরো ধানের বাম্পার ফলন সম্ভব হয়।
জলাবদ্ধতা নিরসন: ২৩ ভেন্টের রেগুলেটরের মাধ্যমে বর্ষাকালে উজানের বিপুল পরিমাণ পানি দ্রুত সাগরে নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়, যা নোয়াখালী ও ফেনী জেলার বিশাল অংশের জলাবদ্ধতা দূর করে।
চর জাগা ও ভূমির প্রসার: ক্লোজার বাঁধ নির্মাণের ফলে পলি জমে আশেপাশের এলাকায় নতুন চর জেগে ওঠে, যা পরবর্তীতে ম্যানগ্রোভ ঝাউবন ও কেওড়া বনে পরিণত হয়।
পর্যটন বিকাশ: নদীর মোহনা, ঝাউবন, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অসাধারণ দৃশ্য এবং রেগুলেটরের চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে মুছাপুর ক্লোজার ও সংলগ্ন সি-বিচ এলাকাটি নোয়াখালীর অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়।
৩. বর্তমান অবস্থা ও সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ
২০২৪ সালের অগাস্টে ধস ও ক্ষতি: ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে দেখা দেওয়া অভূতপূর্ব আকস্মিক বন্যা ও উজান থেকে নেমে আসা প্রচণ্ড পানির তোড়ে মুছাপুর রেগুলেটর ও ক্লোজার বাঁধের একাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে যায়। পানির তীব্র চাপে রেগুলেটরের কাঠামো ও গাইড বাঁধ ভেঙে যায়।
বর্তমান নদী ভাঙন ঝুঁকি: ক্লোজার ও রেগুলেটর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ছোট ফেনী নদীর মোহনায় পুনরায় জোয়ার-ভাটার প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং লোকালয়ে লোনা পানি ঢোকা ও উপকূলীয় এলাকা নদী ভাঙনের নতুন ঝুঁকিতে পড়েছে।
পুনর্নির্মাণ উদ্যোগ: পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত মুছাপুর ক্লোজার ও রেগুলেটর এলাকা পরিদর্শন করে টেকসই পুনর্নির্মাণ ও জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে সাময়িক ও স্থায়ী সংরক্ষণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment