ঢাকা    ,
সংবাদ শিরোনাম : ছোটগল্প: নিহা ও একটি অদৃশ্য উপাখ্যান। একনেকে মুছাপুর রেগুলেটর প্রকল্প অনুমোদন মুছাপুরে উৎসবের আমেজ সন্তানের সঠিক পথচলায় অভিভাবকদের সচেতনতা অপরিহার্য: সহকারী অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ আমার মেয়ে। কবি আল হেলাল। কবি মুঃ ইব্রাহিম খলিল জসিমের কবিতার মেলা। গ্রাম আদালত সক্রিয় হলে সহজে বিচার পাবেন গ্রামের মানুষ: নোয়াখালীতে সমন্বয় সভা কবি কুতুবউদ্দিনের একগুচ্ছ সনেট কবিতা । একনেকে মুছাপুর রেগুলেটর নির্মাণে ৭৫২ কোটি টাকা অনুমোদন কোম্পানীগঞ্জের রাজনীতিতে তিন দশকের পথ চলায় জাহিদুর রহমান রাজন কোম্পানীগঞ্জে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের আহ্বায়ক কমিটির পরিচিতি সভা

ছোটগল্প: নিহা ও একটি অদৃশ্য উপাখ্যান।

ছোটগল্প:  নিহা ও একটি অদৃশ্য উপাখ্যান।

ছোটগল্প:

নিহা ও একটি অদৃশ্য উপাখ্যান।

গোধূলির পথ ধরে কবি হেঁটে চলেছেন। পাশেই লেক। লেকের কালচে জলে সন্ধ্যার শেষ আলোটি ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। অথচ চারপাশে সন্ধ্যা নামার কোনো লক্ষণ নেই। জনাকীর্ণ পথের দুপাশে মানুষের ঢল—কেউ হাঁটছে, কেউ বসে গল্প করছে, কেউ ফুচকার প্লেটে তেঁতুলের জল ঢালছে, কেউ বাদাম ভাঙছে, কেউ ডাবের পানি খাচ্ছে। কোথাও আখের রসের মেশিন ঘুরছে, কোথাও শিশুর হাসি, কোথাও প্রেমিক-প্রেমিকার ফিসফাস। সব মিলিয়ে লেকপাড়ের এই পথটি যেন সন্ধ্যার নিজস্ব এক নগরসভা।কবি জানেন, আর একটু এগোলেই দেখা হবে নির্মাতা মারুফের সঙ্গে। মারুফ—তরুণ উদীয়মান চলচ্চিত্র নির্মাতা। বিনয়ী, ভদ্র, সদালাপী; কথার মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র নেই। এই লেকপাড়ের পথটি তাঁদের প্রায়ই মিলনমেলার জায়গা হয়ে ওঠে। এখানে হাঁটতে হাঁটতে কত কথা যে হয়! সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, সাহিত্য—কোনো বিষয়ই তাঁদের আলাপের বাইরে থাকে না। কখনো তর্ক, কখনো বিশ্লেষণ, কখনো হাসি; আবার কখনো এমন কোনো বিষয় এসে পড়ে, যার শেষ খুঁজতে খুঁজতে রাত গভীর হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর জোনাকির ক্ষীণ আলো আর সন্ধ্যার মিশ্রিত আবছায়ায় সত্যিই দেখা হয়ে গেল তাঁদের।মারুফ এসে দাঁড়ালেন কবির পাশে। তারপর দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলেন। লেকের পাড় ঘেঁষে নাতিদীর্ঘ সেই পথ। ডানে-বামে জনরোল। ফুচকা, বাদাম, ডাব, আখের রস—সবকিছুরই যেন সমাহার। মানুষের কোলাহলকে পাশ কাটিয়ে দুজনের কথার নিজস্ব একটি জগৎ তৈরি হয়ে গেল।মারুফ একটু পেছনে। সামনে কবি। কথা বলতে বলতে কবি এগিয়ে চলেছেন। হঠাৎ—সম্মুখ থেকে এক কিশোরীর হাত উঠল। একটি ইশারা। কবির চোখে পড়তেই তাঁর কথার ধার যেন হঠাৎ থেমে গেল। কে? এই সন্ধ্যালোকে, এই জনরোলে—কে তাঁকে ডাকছে? কবির মনে একসঙ্গে দুটি অনুভূতি এসে ধাক্কা খেল—সুন্দরী রমণীর ডাকে একটুখানি রোমাঞ্চ, আর তার সঙ্গে অকারণ ভয় ও দ্বিধা। তিনি মনে মনে বললেন, ‘কী ব্যাপার! আমাকে ডাকছে? সে আমাকে চেনে কীভাবে?’এর মধ্যেই মেয়েটি কবিকে অতিক্রম করে তাঁর পেছনে থাকা মারুফের কাছে পৌঁছে গেল। মিষ্টি কণ্ঠে বলল—‘মারুফ! হায় মারুফ! আমি নিহা।’ মারুফ যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না।—‘নিহা?’—‘Yes, আমি নিহা।’ মারুফের বিস্ময় তখনো কাটেনি। মেয়েটির মুখে মাস্ক। এই মুখ দেখে চিনবে কীভাবে?হয়তো কবির মতো মারুফের মনেও এক মুহূর্তের সংশয় জন্মেছিল। আর কবি তো এরই মধ্যে নিজের মতো করে একটি আন্তর্জাতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন। মাস্ক-পরা অচেনা তরুণী তাঁকে যে ‘নিহা’ বলে ডাকল—চীনা ভাষার ‘নিহাও’-এর সঙ্গে শব্দটির অদ্ভুত সাদৃশ্য দেখে কবির মনে হলো, হয়তো কোনো চীনা তরুণী! কিন্তু রহস্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মেয়েটি মাস্ক খুলে ফেলল। নিজের মুখ নিজেই পরিচয়পত্রের মতো সামনে মেলে ধরল। মারুফ হতচকিত চোখে তাকিয়ে বললেন—‘ও নিহা! নিহা, তুমি এখানে?’ তারপর শুরু হলো তাঁদের কথোপকথন।কবি একটু সরে দাঁড়ালেন। শরমের ঘোমটা টেনে নয়, বরং নিজের নিঃসঙ্গতার চাদর গায়ে জড়িয়ে। কবি ভাবলেন, তাঁর জীবনে ললনার উপস্থিতি বরাবরই একপ্রকার অনুপস্থিতির নাম। তাই ললনার কাছ থেকে দূরে থাকাই হয়তো তাঁর জন্য একধরনের বেদনামধুর নিরাপত্তা। তিনি খানিক দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু মানুষের কানকে তো আর ইচ্ছেমতো বন্ধ করা যায় না। মারুফ ও নিহার কথোপকথনের কিছু শব্দ বাতাসে ভেসে এসে কবির কর্ণকুহরে দোল খেতে লাগল। তাঁদের কথায় পুরোনো পরিচয়ের উষ্ণতা, স্মৃতির রেশ, পরিচিত মানুষের স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য।নিহা মিডিয়ার পরিচিত মুখ। মডেল হিসেবে তাঁর পরিচিতি আছে। আর মারুফ চলচ্চিত্র নির্মাতা। ফলে তাঁদের পরিচয় থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কবি দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তবু তাঁর ভেতরে কোথাও যেন একটি ছোট্ট হাসি জন্ম নিল। মানুষের জীবনও বড় বিচিত্র! কারও সঙ্গে দেখা হয় পরিকল্পনা করে, আবার কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যায় পথের ধারে—জোনাকির আলোয়, কোলাহলের মাঝখানে।কথা বলতে বলতে একসময় মারুফ বললেন—‘চলুন না, সামনে একটা ক্যাফেটেরিয়া আছে। সেখানে বসে গল্প করা যাবে।’ কবিকে অতিক্রম করতে করতে মারুফ বললেন—‘আঙ্কেল, চলুন।’ কবি চোখ নামিয়ে মৃদুস্বরে বললেন—‘জি।’ নিহাও সালাম দিলেন। কবি সালামের উত্তর দিয়ে বললেন—‘জি, চলুন।’মারুফ আর নিহা সামনে। দুজন পাশাপাশি। কথার ঝুঁটি বেঁধে। আর তাঁদের দুই-তিন কদম পেছনে কবি—একাই। ক্যাফেটেরিয়ার দিকে এগোতে এগোতে কবির মনে হলো, পৃথিবীর সব যাত্রাই কি এমন? কেউ সামনে হাঁটে দুজন হয়ে, আর কেউ পেছনে থাকে একা। কেউ গল্পের সঙ্গী পায়, কেউ গল্পেরই সঙ্গে কথা বলে।ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুকতেই সামনে লেক। তার পাশেই টেবিল-চেয়ার সাজানো। মারুফ বসলেন। নিহাও বসলেন। তারপর দুজন একসঙ্গে কবিকে ডাকলেন—‘আসেন আঙ্কেল, আসেন। এখানেই বসুন।’ কবি থমকে গেলেন। ‘আঙ্কেল!’ শব্দটি খুব ছোট। কিন্তু কখনো কখনো একটি ছোট শব্দ মানুষের মনের ভেতর দীর্ঘতম করিডোর খুলে দেয়। নিহাও তাঁকে ‘আঙ্কেল’ বললেন। কবি হেসে বললেন—‘না, ঠিক আছে। আপনারা বসুন। গল্প করুন। আমি এই যে এখানেই আছি।’তিনি তাঁদের পেছনের দুই টেবিল দূরে গিয়ে একা বসে পড়লেন। সম্ভবত এই জীবনে কবির সঙ্গী বলতে কবিতা ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি মনে মনে ভাবলেন—মানুষ কখনো কখনো নদীর মতো একাই চলে। বাঁক বদলায়, তীর বদলায়, দৃশ্য বদলায়। শুধু গন্তব্যের দেখা মেলে না। নদী সমুদ্রের দিকে ছুটে যায়—কিন্তু কবির নদীটি যেন অনন্তকাল ধরে সমুদ্র খুঁজেও কোনো সমুদ্র পায় না।এদিকে সামনে থেকে ভেসে এলো—‘কী খাবেন?’—‘আপনি চয়েস করুন না।’ কবি বুঝতে পারলেন, মারুফের পকেটের অবস্থা খুব একটা সুবিধার নয়। এটি তাঁর স্বাভাবিক অবস্থা নয়। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যে প্যান্টের পকেটে টাকা থাকে, সেই প্যান্টটিই ভুল করে বাড়িতে রেখে এসেছেন। কবি দূর থেকে শুনতে শুনতে মৃদু হাসলেন।নিহা বললেন—‘ভাইয়া, আপনি কী খাবেন? কী খেতে মন চাচ্ছে? আমি আপনাকে খাওয়াবো।’ মারুফ একটু অপ্রস্তুত হলেন। ব্যক্তিত্ব বলে একটা বিষয় আছে। তিনি বললেন—‘না, আমি তেমন কিছু খাবো না। আমি আর আঙ্কেল মিলে তো অনেক কিছু খাওয়া হয়েছে, গল্পও করা হয়েছে। আমার শুধু কফি হলেই হবে।’ তারপর নিহাকে জিজ্ঞেস করলেন—‘আপনি কী খাবেন?’—‘না, আমিও তেমন কিছু খাবো না। রাত অনেক হয়েছে। কফি খেতে পারি।’হঠাৎ নিহা আবার কবির দিকে তাকিয়ে উচ্চকণ্ঠে বললেন—‘আঙ্কেল কী খাবেন?’ কবির মননে যেন কষ্টের রেখা আর একটু প্রসারিত হতে লাগল। কবিমনে খানিক ক্ষুদ্র আগ্নেয়গিরির উদ্গীরণ ঘটল। মারুফ আর কবি অনেকটা কাছাকাছি বয়সের এটি নিহাকে কে জানাবে! আর জানলেই বা কি হবে? কবির কপালে বিরক্তির ভাঁজ, কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসি। তিনি বললেন—‘আমি তো এই মুহূর্তে কিছুই খেতে চাইছি না। আপনারা কী খাবেন?’—‘আমরা কফি খাবো।’—‘ঠিক আছে। আমিও কফি খেতে পারি। আপনারা অন্য কিছু খাবেন, বলেন।’—‘না, আর কিছু খাবো না।’কবি আর কথা বাড়ালেন না। নিজের ডিভাইসটি বের করলেন। এখন তাঁর সামনে আর কোনো সঙ্গী নেই। আছে একটি সাদা পর্দা, কিছু অক্ষর, কিছু অসমাপ্ত চরণ। কবি লিখতে শুরু করলেন। কিছু মানুষ গল্প করে মানুষের সঙ্গে। কিছু মানুষ গল্প করে শব্দের সঙ্গে। কবি দ্বিতীয় দলের মানুষ। তাঁর এই মুহূর্তের পার্টনার যদি কেউ থাকে, তবে সে তাঁর কবিতা।মারুফের পাশে একজন ললনা বসে আছে। কবির পাশে বসে আছে একটি কবিতা। কেউ চাইলে একজন সুন্দরী সঙ্গিনীর সঙ্গে অগণন রাত, বিকেল, কাকডাকা ভোর পার করে দিতে পারে। আর কেউ কেউ শব্দের সঙ্গে বসে পুরো জীবন পার করে দেয়।সামনের টেবিলে কফির কাপ নামল। চুমুকের সঙ্গে সঙ্গে মারুফ ও নিহার গল্পও জমে উঠল। তাঁদের কথার ফাঁক দিয়ে কিছু শব্দ দক্ষিণের বাতাসে ভেসে এসে কবির কর্ণকুহরে স্পর্শ করছিল। কিন্তু কবি এবার অন্যমনস্ক নন। তিনি কবিতার সঙ্গে গল্প করছেন। একটি নতুন কবিতা তাঁর ডিভাইসের পর্দায় ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে। একটি চরণ। তারপর আরেকটি। তারপর আরেকটি।কবির মনে হলো—মানুষেরও তো অনেক রকম ক্যাফেটেরিয়া আছে। কেউ বসে কফির টেবিলে। কেউ বসে স্মৃতির টেবিলে। আর কেউ বসে শব্দের সামনে।রাত বাড়তে থাকে।হঠাৎ কবির কর্ণকুহরে কিছু কথার শব্দমালা খুব থোকায় থোকায় এসে জড়ো হতে লাগল।নিহা বেশ শব্দ করেই বলছে—‘মারুফ ভাই, জানেন, আমি যদিও পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে অনেক সময় এ রকম—মানে, খোলামেলা পোশাক পরতে হয়, কিন্তু আমার ভেতরে আমার সৃষ্টিকর্তার ভয় সবসময় কাজ করে। আমি চেষ্টা করি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে, ইভেন…’একটু থেমে সে আবার বলল—‘যেহেতু আমি আমার বাসায় একা থাকি, তাই শোয়ার আগে দোয়া-দরুদ পড়ে, সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরি করে তারপর ঘুমাতে যাই। মনে হয়, মানুষ তো জানে না কখন তার ডাক এসে যায়। যদি কোনো রাতে আমি মারা যাই, আর সকালে কেউ এসে আমাকে দেখে—তাহলে অন্তত যেন বলতে পারে, “মেয়েটা ভালো মেয়ে ছিল।”’কথাগুলো শুনে কবি কিছুটা নড়েচড়ে বসলেন।কী বলছে এই মেয়েটা!তিনি যেন হঠাৎ নিজের ভেতরেই কোথাও থমকে গেলেন। অবিশ্বাস আর বিস্ময়ের এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতিতে কবি অনেকক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলেন নিহার অবয়বের দিকে।এই তো সেই মেয়ে—যাকে এতক্ষণ তিনি দেখছিলেন কেবল তার বাহ্যিক পরিচয়ের ভেতর দিয়ে। অথচ মানুষের ভেতরটা কি কখনো পোশাক দিয়ে পড়া যায়?কবির মনে হলো, আমরা মানুষকে কত সহজেই বিচার করে ফেলি—একটি দৃশ্য দেখে, একটি পোশাক দেখে, একটি পেশা দেখে, কয়েকটি শব্দ শুনে। অথচ একজন মানুষের অন্তর্গত পৃথিবী কত গভীর, কত অদৃশ্য—তার খবর আমরা কজনই বা রাখি!নিহার কথাগুলো কবির ভেতরে অদৃশ্য কোনো দরজা খুলে দিল। তাঁর হৃদয়ে নিহার প্রতি জন্ম নিল এক গভীর শ্রদ্ধা, এক অচেনা সম্মান। এ সম্মান সৌন্দর্যের জন্য নয়, পেশার জন্য নয়, কোনো পরিচয়ের জন্যও নয়—এ সম্মান একজন মানুষের নিজের ভেতরে ভালো থাকার যে নিরন্তর আকাঙ্ক্ষা, তার প্রতি।কবি নীরবে বসে রইলেন। লেকের ওপারে তখন জোনাকিরা জ্বলে উঠেছে। একটি, তারপর আরেকটি, তারপর আরও একটি।কবির মনে হলো—মানুষের ভেতরেও কি এমনই কিছু জোনাকি থাকে? যাদের বাইরে থেকে দেখা যায় না, অন্ধকার নেমে এলে তবেই হঠাৎ জ্বলে ওঠে।সেই রাতে কবি শুধু একটি মেয়ের কথা শুনলেন না; তিনি যেন মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অদৃশ্য আত্মার সঙ্গে পরিচিত হলেন। আর সেই মুহূর্তটি—তাঁর জীবনের এক ভিন্নরকম সময়ের নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।কবির ছলছল চোখে তখন জলরেখা খেলা করছিল। কিন্তু সেই জলকে মাটির সীমানায় গড়িয়ে পড়তে দিলেন না। জলের আবেগ জলের ভেতরেই স্তিমিত করে রাখলেন।আর ভেতরে ভেতরে নিহার জন্য দোয়া করতে লাগলেন—হে খোদা দয়াময়, তুমি তোমার এই বান্দিকে উভয় জাহানে রক্ষা করো। তার সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করো। তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের পথ থেকে তাকে কখনো বিচ্যুত করো না। আর তোমার সন্তুষ্টি লাভের আগেই যেন তার জীবনের পরিসমাপ্তি না ঘটে।ঘড়ির কাঁটা তখন এগারোটার কাছাকাছি। লেকের ওপর রাত আরও ঘন হয়ে এসেছে। জোনাকির আলোও এখন দূরের কোনো ক্ষুদ্র নক্ষত্রের মতো—অস্পষ্ট, অথচ আশ্চর্যরকম জীবন্ত।হঠাৎ মারুফ বললেন—‘উঠুন। রাত অনেক হয়েছে।’কবি মাথা তুললেন।—‘আসলেই তো! রাত দেখি অনেক হলো।’নিহা ওয়েটারকে ডাকল—‘এই মামা, আমাদের বিলটা নিয়ে এসো।’কিছুক্ষণ পর বিল এলো। কবি নীরবে বিলটি নিজের হাতে তুলে নিলেন। তারপর কোনো কথা না বলে পরিশোধ করে দিলেন।নিহা অবাক হয়ে বলল—‘আঙ্কেল, কী করলেন?’মারুফও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—‘কী করলেন, আঙ্কেল! আমি দিতাম।’আবার আঙ্কেল- কবি শুধু মৃদু হাসলেন।কিছু কথা বলা যায় না। কিছু কথা বললে বন্ধুত্ব ছোট হয়ে যায়।কবি জানতেন—মারুফের পকেট আজ শূন্য। পকেটে ক্রেডিট কার্ড আছে ঠিকই, কিন্তু এই ক্যাফেটেরিয়ায় ক্রেডিট কার্ডের কোনো ব্যবস্থা নেই। আর অতিথি হিসেবে নিহার কাছ থেকে বিল নেওয়াটাও তাঁর কাছে শোভন মনে হলো না। তাই দায়িত্বটি তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।জীবনে এমন কিছু বিল থাকে, যেগুলো টাকা দিয়ে পরিশোধ করা যায়। আবার এমন কিছু বিলও থাকে, যেগুলো মানুষ নিজের নিঃসঙ্গতা দিয়ে পরিশোধ করে।সেদিনের বিলটি কোন শ্রেণির ছিল—কবি কাউকে বললেন না।তিনজন ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে এলেন। লেকের কালো জলে রাতের আলো কাঁপছে। মারুফ ও নিহা আবার পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলেন। কবি তাঁদের পেছনে। কয়েক কদম দূরে—একাই।তবু তিনি একা নন।তাঁর হাতে একটি নতুন কবিতা।হয়তো সেটিই তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী।আর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত পরিতৃপ্তি নিয়ে কবি ফিরছেন তাঁর নিজ গন্তব্যের দিকে।আজ নিহার প্রকৃত পরিচয় কবির বহু পুরোনো একটি বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে দিল—মানুষকে তার দৃশ্যমান পরিচয়ে কখনো সম্পূর্ণ চেনা যায় না।আজ যে নিহাকে কবি আবিষ্কার করলেন, তাকে হয়তো আর কখনো কেউ এভাবে আবিষ্কার করতে পারবে না। নিহা হয়তো আর কখনো কারও কাছে আজকের নিহা হয়ে উঠবে না।কারণ কিছু মানুষ জীবনে আসে—একটি মুহূর্তের জন্য, একটি কথার জন্য, একটি অপ্রত্যাশিত সত্যের জন্য।তারপর তারা ফিরে যায় নিজেদের অদৃশ্য জীবনে।কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া আলোটি থেকে যায়—কোনো কবির হৃদয়ের গভীরে, কোনো অসমাপ্ত কবিতার পঙ্‌ক্তিতে, অথবা কোনো নিঃশব্দ প্রার্থনার ভেতর।সেদিন রাতের পর কবির অন্তরাত্মায় শুধু একটি আকুতিই রয়ে গেল—আজকের নিহারা যেন স্রষ্টার নিরাপত্তার বেষ্টনীর ভেতরেই থাকে। তার অন্তরের জোনাকিটি যেন কোনো অন্ধকার এসে নিভিয়ে দিতে না পারে।কবি হাঁটতে থাকলেন-শহর তখন গভীর রাতের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে। পেছনে পড়ে রইল লেক, ক্যাফেটেরিয়া, জোনাকির আলো, মারুফ ও নিহার পাশাপাশি হাঁটার ছায়া।আর সামনে—একটি অদেখা ভোর।কবি সেই ভোরেরই খোঁজে হাঁটতে লাগলেন।

মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন

কবি ও লেখক

Best Regards .Mohammad Kutubuddin.CEOSkymode International.Poet , Editor & WritersChief AdvisorNovo Joti newsFounderNational Writers Council.Central member of nationalist Writers Forum.Corporate Office:J-126, Rowshan Villa. Gulshan-Link Road. Dhaka-1212. Bangladesh . Cell : 8801798595925Email: ops.skymode2009@gmail.com

Comments (0)

Be the first to comment on this article.


Leave a comment

Your comment will be reviewed before publication.