"কবি মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিনের একগুচ্ছ কবিতা"
## অলৌকিক হাঁকডাক
কুকুরগুলো জড়ো হয়ে যায় শিকারে
হায়েনারাও তাই
শুধু মহিষের পাল গর্জন ছেড়ে
অবশেষে পালায় শেয়ালের পথ ধরে
কারো কারো ডাকে ঘেঁষে
দূরত্বের সীমারেখা টেনে আনে
অলৌকিক হাঁকডাকে কেটে পড়ে
আপন রাস্তার আইল মেপে
বীরত্বের তান্ত্রিক মন্ত্র
জোটে না ভীরুদের তকদিরে
বিশ্বাসের নিঃশ্বাস পড়ে চূড়ান্ত ফয়সালায়
সাহসীরা তা করে দেখায়
জোনাকির শুভঙ্করী আলোকরশ্মি নেভে আর জলে
ভীরুদের আজন্মা খোঁজ আলেয়ার পিছে
বীর যারা- আধাঁরের ফটক সরিয়ে এনে দেয় নক্ষত্রের জ্যোতি
---
## গুপ্তধন
আমার কাছে একটি গুপ্তধন আছে যার সন্ধান
আমি তোমাদের বলব না
তাচ্ছিল্যের আবরণ মেখে প্রত্যহ যাহা ছুড়ে ফেলে দাও
যার স্বরণ বেমালুম ভুলে থাকতে তোমাদের অপরিচ্ছন্ন ইন্দ্রিয় কাজ করে যায় নিরবধি
দহনের অগ্নিকাঠ যার পবিত্র হৃদপিন্ডে হানে আঘাত
ক্ষোভের লাভা নির্মাণ করে
নির্গত কর যার চৌচির জমিনে
অথচ; মহাকালের এই সজ্জিত অবয়ব
ব্যস্তময় নগরীর আলখাল্লা, প্রমোদ তরীর জলরাশি
বাজপাখির ডানায় চড়ে দেশান্তরির মাতম বুথ
এতসব অচেনাপথের এই চেনালোকের দিগ্দর্শক
যার ছিদ্রান্বেষণে- প্রকাণ্ড দেহাবসান নিশ্চিন্তে আসন গেড়ে
স্থান করে নিলে স্বপ্নময় ভাবনার এই মোহময় ঠিকানায়
আমার কাছে একটি গুপ্তধন আছে যা
আমি তোমাদের বলব না
বারবার আঘাতেও ফিরে আসে পূর্ণিমার সুরত মেখে
নিরালোক রাত ভেদ করে নিয়ে আসে日の জ্যোতি
হয়তো বা উপেক্ষার উপাখ্যানে অপায়েংতর
অবসাদ আর প্রহারের সমাপ্তি চিহ্নমূলের আদিম ঠিকানায়
---
## অধরা অন্ধকার
অন্ধকারের ডেরায় ডুকে পড়ে জোনাকির পাল
সঞ্চিত আলোর ট্যাঙ্ক খুলে
টিপে দেয় সুইস
জ্বলে আর নেবে
অধরা অন্ধকারে সেজেগুজে নড়ে উঠে ভূতের আঁচল
উঁকি দেয় ধোকার চোখ
এনে দেয় আঁধারের সিন্দুক
শুধু, বারবার মিলিয়ে যায় জোনাকির রুপ
---
## আমার শবাধার
এই বিধ্বস্ত মুখায়ব দেখে দেখে
তোমার বিরক্তির রেখাগুলো প্রায়শই দীর্ঘতর হত
কাকডাকা স্বরে ব্রু কুচকে কেটে পড়তে
আমার উপস্থিতিতে তোমার অস্বস্তির-
ডালপালাগুলো জেগে উঠত - চলতো প্রগলভ হইচই
কিন্তু না, আজ তুমি আহ্লাদে আটখানা হবে
আজ তোমার ফড়িং মনে প্রশান্তির ভাঁজ
চকচক করে উঠবে
আজ আমার উপস্থিতিতে, তোমার স্থাবর ভাবনাগুলো আন্দোলিত হয়ে উল্লম্ব ঢেউয়ের মাতম ঘটবে
এতকালের তেতো স্বাদ চুকিয়ে জিবের নল বেয়ে
তৃপ্ত স্বাদের নহর বইবে
দেখ, রাতের প্রহরায় ভোর এলো নেমে
ঘাসের পালকে শিশিরের চোখ অনিমেষ তাকিয়ে
শবাধার গায়ে মাখামাখি গোলাপের জল
প্রাতঃস্নানে সাজিয়ে - তুলে দিয়েছে রোদের আঁচলে
নীলাম্বরী বেয়ে বৃষ্টিরা খেলা করে তাথৈ
দরিয়ার উত্তাল চোখ উপেক্ষা করে
মহাঝটিকার সাইরেন বাজিয়ে স্পর্শ করে যায়
নির্মল বাতাস - ছুঁয়ে যায় অশ্বতের ঢাল
অরণ্যের বেদন আর পাখিদের কুঞ্জরণ এখানে একাকার
চেয়ে দেখ, পথের বাঁকে বাঁকে পথের ধুলি
হামাগুড়ি দিয়ে জাগিয়ে দেয় স্মৃতির অতীত
---
## তুমি এলে
তুমি এলে ভোরের ডাকে সুরুজ কাঁধে নিয়ে
তুমি এলে আধার রাতে চাঁদের উঁকি দিয়ে
তুমি এলে চোখ রাঙ্গিয়ে ভয় সরিয়ে দিতে
তুমি এলে ন্যায়ের পথে বাঁধা রুদ্ধ করতে
তুমি এলে ধ্বংস নিয়ে গড়তে নতুন দিন
তুমি এলে ফয়গাম নিয়ে চুকতে খোদার ঋণ
তুমি এলে দাঁড়ি পাল্লায় দিতে ওজন মেপে
তুমি এলে দ্রোহের ডাকে উঠতে ফুলেফেঁপে
তুমি এলে সাগর বুকে ঢেউয়ের ফনা তুলে
তুমি এলে শত নদীর স্রোতের প্রতিকূলে
তুমি এলে অর্শ দৌড়ে রক্ষী ছিন্নমূলের
তুমি এলে বল্লম হাতে ভাঙতে জালিমকুলের
তুমি এলে বাবা হারা ছেলের বাবা হয়ে
তুমি এলে বোনের চোখে কান্না ক্ষয়ে ক্ষয়ে
তুমি এলে দুঃখ সয়ে সুখের পথের পানে
তুমি এলে আপন হয়ে পরের মায়ার টানে
তুমি এলে শিক্ষাঙ্গনে রুদ্রপ্রতাপ জ্বেলে
তুমি এলে শিক্ষা দানের দীক্ষা নিয়ম ফেলে
তুমি এলে সত্যের আওয়াজ বজ্জ্র ধ্বনি দিয়ে
তুমি এলে মিথ্যেরা সব পড়ে গঙ্গা গিয়ে
তুমি এলে ভয়ের রশি ছিঁড়তে অতি রেগে
তুমি এলে বাধার প্রাচীর ভাঙতে প্রলয় বেগে
তুমি এলে বীরের বেশে লক্ষ বীরের সন্ধানে
তুমি এলে আম জনতার মনের কথার আল্পনে
তুমি এলে আপন দ্রোহে পরের কথা বলতে
তুমি এলে এই মাটিতে বুক ফুলিয়ে চলতে
তুমি এলে জালিমের তখত, থাকে ভয়ের ঘোরে
তুমি এলে চোর- লুটেরা পালায় দূরের চরে
---
## তুমি নক্ষত্ররাজ
ঘুমন্ত প্রজন্মের শিনায়
ঢেলে দিলে দ্রোহের অগ্নি
নিয়ে গেলে চেনা অতীত -
ঐতিহ্যের স্মৃতিস্তম্ভে
গচ্ছিত রেখে গেলে মুক্তির চিরকুট
বাউন্ডেলে যুবকের
আলুথালু মগজভাঁজে
তুলে দিলে ইতিহাসের সবক
জাগিয়ে তুললে -
কোটি জনতার তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখ
মরচে ধরা রাষ্ট্রের চৌকাঠে
এঁকে দিলে রকমারি পেইন্ট
অন্ধকারের জমিনে
খানাখন্দের অলিগলি
রাঙ্গিয়ে দিলে আলোকরশ্মির স্রোত
তুমি ধূমকেতু,
বাঁধার প্রাচীর ভাঙা বজ্রধ্বনি
দুনিয়ার মসনদ কাঁপানো
এক বিপ্লবী অবতার
তোমার তেজস্বী হাঁকডাকে
প্রভাতের লাল চোখে
জেগে উঠেছে সাহসের রেখা
রক্তলিপ্সু আটলান্টার খুনেচোখ কিংবা-
সীমান্ত-পারের মসনদ
পারেনি তোমার দৃষ্টির অটল রেখা টেনে দিতে
তুমি জন্মান্তরে-
ভোরের উদিত সুরুজ
লালসবুজের সীমান্ত প্রহরী
তুমি সংগ্রামী চেতনার অগ্রনায়ক
সময়ের চোখে চোখ রেখে
তুলে দিলে খোদার ফরমান
খোদার রাহে হাসতে হাসতে
উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বাসে তৃপ্ত চিত্তে
মৃত্যুকে ডেকে এনে করলে আলিঙ্গন
এই মহাকালের অমাবস্যায়-
তুমি নক্ষত্ররাজ
দিয়ে গেলে জ্বলে উঠার চিরস্থায়ী সিলেবাস
---
## চুকিয়ে দিলে রক্তের ঋণ
যে মাটির বুক চিরে তোমার রাজসিক আত্মপ্রকাশ
সেই মাটিকেই আদিগন্ত জড়িয়ে নিলে আদরের আঁচলে
সমর্পণ করলে আপন অভিজ্যাত্বের সকল বাসনা-
কুড়িয়ে নিলে হিসেবের খতিয়ান
জাতির মুক্তির হাইপারসনিক-
যার ছায়ায় ছিলে অতন্দ্র প্রহরী
বেঁধেছিলে কষ্টের পাথর -
সেই হাইপারসনিক হারিয়ে ভেঙ্গে পড়েনি
তোমার জাগ্রত বিবেক ও বিপ্রতীপ জাতসত্তা
মাটির আঁচল জড়িয়ে আটপৌরে কাটিয়ে দিলে বেলা-
চুকিয়ে দিলে রক্তের ঋণ
ভয়ের অশুভ দৃষ্টি- আপোসের সবক,
উপেক্ষার উপাখ্যান আর নীতিবোমার সাইরেন
আতঙ্কিত রেখেছিল নপুংসক নরাধম শাবকদের
সময়ের শকট ধরে
ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে
বাংলার অভিধানে,
মহাকালের প্রতিটি মোহনায়
প্রজন্মের চেতনার দ্রোহে
জনতার শোরগোলে -
তোমার আলোচন মোহময় রাখবে- তোমার বন্দনায়
---
## সাহসের ডানা
বিজয়ের মুকুট পরে আসবে স্বরূপে
প্রজন্মের দ্রোহে চড়ে দাঁড়াবে বীরদর্পে
সাহসের ডানা মেলে চুকবে একাল
তোমার দারাজ শব্দে জাগবে সকাল
যে স্বপ্নবীজ এঁকে দিলে জনতার মঞ্চে
উত্তাল জনতা রাজপথে প্রহর গুনছে
কাপুরুষ হারিয়ে হুঁশ চলে নটের মতো
পরাজয়ের চিহ্ন এঁকে রেখে যায় ক্ষত
দ্রোহের বীণ বাজিয়েছ, তুমি অকুতোভয়
প্রলয়ের বেশে এসে তুলে নেবে বিজয়
---
## আবার জন্ম হোক মাটির প্রেমে
মাটির গন্ধ আঁচড় মেরে, তুলে দাও ওপারে
মালির চাকে আঘাতে আঘাতে
শূন্যসার কর মেধার শুক্রাণু
রক্ষীর আলখাল্লা পরে, গর্ভার উর্বরী জঠর
গুম কর কাপুরুষ ডঙ্গে !
প্রজন্মের মুখ ফিরিয়ে দেয়া উপঢৌকন থু থু
ঘৃণার আঁচড় খেয়ে তোরা এবার পরিধান কর লজ্জার ছাদর
তোদের আবার জন্ম হোক মাটির প্রেমে।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment