ঢাকা    ,
সংবাদ শিরোনাম : বসুরহাট বাজারে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জামায়াতের সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ কবি মুঃ ইব্রাহিম খলিল জসিম এর কাব্য। হাজারীহাট হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে মেধাবীদের বৃত্তি ও সাবেক শিক্ষার্থীর চিকিৎসায় সহায়তা জুলাই আন্দোলনে আমার স্মৃতিময় একদিন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বৈষম্য দূর করে জাতীয়করণের দাবি "তবুও ঘোর কাটেনা" মনিরা ইসলাম ডেঙ্গু প্রতিরোধে বসুরহাটে জামায়াতের লিফলেট বিতরণ কোম্পানীগঞ্জে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ ফারুক ভূঞার ৯ম স্মরণসভা ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে কোম্পানীগঞ্জে শিক্ষকদের মর্যাদা ও বৈষম্য দূরীকরণে জাতীয়করণের দাবি চরহাজারী ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে প্রার্থী "কামরুন নাহার লিপি"

জুলাই আন্দোলনে আমার স্মৃতিময় একদিন

জুলাই আন্দোলনে আমার স্মৃতিময় একদিন

জুলাই আন্দোলনে আমার স্মৃতিময় একদিন

লেখক: ইদ্রিস হাসান।

​জুলাই আন্দোলনের দিনগুলো হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে।

​যুগে যুগে পৃথিবীতে কত বিপ্লব সংঘটিত হয়, সেই বিপ্লবে নিজেকে সৈনিক হিসেবে কতজন পরিচয় দিতে পারে?

​২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান তরুণ প্রজন্মের কাছে এক মহা বিপ্লবের নাম। ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে কতজন কতভাবে লড়াই করেছে।

অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সাহসী ছাত্র-জনতার হাত ধরে ফ্যাসিস্ট হাসিনার অবসান ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হয়।

আমি ৫২-র ভাষা আন্দোলন দেখিনি, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান দেখিনি, ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখিনি; আমি দেখেছি ২৪-এর জুলাই আন্দোলন, যে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে নিজেকে ধন্য মনে হয়।

সেই আন্দোলনের একেকটা ঘটনা যেন একেকটা ইতিহাস, একেকটা উপন্যাস!

​২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের রায়ে ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে।ছাত্র-জনতা প্রতিবাদ জানায়।

বিনা-ভোটের সরকার স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা তার অবৈধ সিদ্ধান্তে অটল। ভাবছে কিছুই হবে না, পুলিশ প্রশাসন এবং নিজ দলের ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আন্দোলন থামিয়ে দেবে। কিন্তু আন্দোলন থামেনি।

জুলাই মাসব্যাপী আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়। সারা দেশের স্কুল-কলেজের ছাত্ররা মাঠে নেমে আসে। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাও আন্দোলনে যোগ দেয়।

সাধারণ জনতা ছাত্রদের পাশে দাঁড়ায়। আন্দোলন দেখে শেখ হাসিনা দিক-বিদিক হারিয়ে ফেলে। বেফাঁস বক্তব্য শুরু করে। ছাত্র-জনতা সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে যেতে বাধ্য হয়। শেখ হাসিনা ভীত হয়ে আন্দোলন থামাতে বল প্রয়োগ শুরু করে।

তার লেলিয়ে দেওয়া আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ বাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে হামলা চালায়।

​১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে রংপুরে আবু সাঈদ নিহত হন। একই দিনে চট্টগ্রামে নিহত হন ওয়াসিম আকরাম। দেশের কোটি কোটি মানুষ নির্বাক হয়ে সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড দেখেছে।

একের পর এক শহীদ হয় মীর মুগ্ধ, ফাইয়াজ, তুরাবসহ অসংখ্য ছাত্র। সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় অবৈধ সরকার। যতটুকু সম্ভব ফেসবুকসহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছি। ইন্টারনেট বন্ধের পর বিভিন্ন মাধ্যমে আন্দোলনের খোঁজখবর নিচ্ছি।

​এই আন্দোলনে আমাদের নোয়াখালীর অনেক তরুণ জীবন দেয়, অনেকে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়, ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের একজন তরুণ দুই চোখের আলো হারিয়ে চিরতরে অন্ধ হয়ে যায়।

​নোয়াখালী জেলার আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মাইজদী শহরে।

​সারা দেশে আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। একজন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাকে আগে থেকে চিনি। একবার নোয়াখালী মাইজদীতে ঢাবি ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ইংরেজির স্পেশাল ক্লাস নিয়েছেন তিনি।

তখন তার সাথে দেখা হয়। আন্দোলনে তার নেতৃত্ব দেখে ভালো লাগল।

​সারা দেশের মতো নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদী আন্দোলনে উত্তাল। পরিচিত সকল ছাত্রনেতাকে অংশগ্রহণ করতে দেখেছি। আবু সায়েদ সুমন ভাই, হাবিব ভাই,বোরহান ভাই, হেদায়েত উল্লাহ মাসুদ ভাই, হাফেজ ফুয়াদ ভাই, সাহাব উদ্দীন ভাইসহ অনেককে।

​প্রাণটা শুধু উন্মুখ হয়ে থাকত আন্দোলনে যাওয়ার জন্য। আন্দোলনে যাওয়ার ডাক এল, মনটা আনন্দে নেচে উঠল। আন্দোলনে যাব, যুদ্ধ করব, হয় শহীদ হব, না হয় গাজী হয়ে ফিরে আসব।

​তখনকার সময় আমি বেসরকারি একটা ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতাম। বাড়ি থেকে ৩ কিলোমিটার হবে। একটা টিউশনি ছিল। সেটা শেষ করে নিজ প্রতিষ্ঠানে চলে যেতাম। সেদিন যথারীতি ছাত্রদের বাড়িতে টিউশনি শুরু করি।

একটু পরে ঘোষবাগ ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি ইউছুফ ভাইয়ের কল পাই ;আন্দোলনে যেতে হবে! টিউশনিতে কোনোভাবে আর মন বসছে না। মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক হাফেজ নূর আহমেদ ভাইকে কল দিয়ে বিষয়টা জানালাম।

তিনি বললেন, কোনো ছুটির দরকার নেই, প্রতিষ্ঠানে আসা লাগবে না, আপনি আন্দোলনে যেতে পারেন। মনে আর তর সইছে না। মনের ভেতর ব্যাপক উত্তেজনা কাজ করতেছে। দ্রুত সাইকেলের প্যাডেল চাপিয়ে বাড়ির পথের দিকে রওনা দিলাম।

বাড়িতে পৌঁছানোর আগে চাচাতো ভাই রায়হানের সাথে দেখা। জিজ্ঞেস করলাম, কই যাচ্ছিস? উত্তর দিল, আন্দোলনে। বললাম, ওয়েট কর, আমিও যাব। সে বলল, ওকে। আমি বললাম, হালিমের মোকাম অপেক্ষা কর, কোনোভাবে আমাকে রেখে যাবি না। একসাথে যাব। বাড়িতে এসে তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে বেরিয়ে যাই। অল্প-স্বল্প বৃষ্টি হচ্ছে। একটা রেইনকোট কোনো মতে গায়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হালিমের মোকাম এসে আমরা একটা অটোরিকশায় উঠলাম।

​সকাল সকাল আমাদের দেখে অনেকে জিজ্ঞেস করল, তোরা কোথায় যাচ্ছিস? কোনো মতে উত্তর দিয়ে পাস কাটিয়ে গেলাম। অনেকে বুঝে ফেলেছে আমরা আসলে এই সকাল সকাল কোথায় যাচ্ছি।

মনের ভেতর ভয়, কেউ ধরিয়ে দেয় কি না, আওয়ামী লীগ হামলা করে কি না, পুলিশ গ্রেপ্তার করে কি না! কবিরহাট পৌঁছে রেইনকোট ঝামেলা মনে করে ফেলে দিই। চাচাতো ভাই মাসুমও আন্দোলনে যাওয়ার অপেক্ষায়।

আমরা মোট ৫ জন সিএনজি করে মাইজদী পৌর মার্কেটে পৌঁছে যাই। পথে নানারকম ভয় ছিল, কারণ পথে পথে ছাত্রলীগ চেকপোস্ট বসিয়েছিল।

দিনটি ছিল ৪ই আগস্ট।

​একে একে পৌর মার্কেটের সামনে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকে। আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে সবার হাতে হাতে দেখা গেল ইট-পাটকেল ও লাঠি।

সবার চোখে-মুখে প্রতিবাদ আর প্রতিশোধের স্ফুলিঙ্গ। চারদিক থেকে স্লোগান-মিছিল শুরু হলো।

​এদিক-সেদিক চোখ বুলিয়ে দেখি আমার নিজ উপজেলা কবিরহাট থেকে শত শত মানুষ আন্দোলনে শরিক হয়েছে। আমার ইউনিয়ন ঘোষবাগের অনেকের সাথে দেখা।

মাহমুদ, সাগর, ফরহাদ, হাফেজ দেলোয়ার, মাওলানা আবদুর রব, খায়ের স্যারসহ অনেকে এসেছিলেন। একই প্রতিষ্ঠানের কলিগ মাওলানা নাসির উদ্দিন, তিনিও যে ডিউটিতে না গিয়ে আমার মতো আন্দোলনে এসেছেন, তার সাথে সাক্ষাৎ না হলে জানতাম না।

​পুরো মাইজদী শহর ছাত্র-জনতা আর আমজনতার দখলে। হাজার হাজার মানুষ ফ্যাসিস্ট হাসিনা থেকে মুক্ত স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদনে লড়ছেন। নোয়াখালীর বীর সাহসী সন্তানরা সেদিন নোয়াখালীকে হাসিনা থেকে স্বাধীন ঘোষণা করে।

​৪ই আগস্ট দেখেছিলাম ছাত্রশিবিরের কৌশলী ভূমিকা আন্দোলনকে কীভাবে শক্তিশালী করেছে। প্রতিটি অলিতে-গলিতে ছাত্রশিবিরের কিছু জনশক্তিকে পাহারারত অবস্থায় দেখেছি। চাচাতো ভাই মাসুমকেও একটি গলিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। বললাম, সবাই একসাথে আছে, তুই একা এখানে গলির মুখে কেন?

​সে বলল, ভাইয়া আমি যেতে পারব না, সংগঠনের নির্দেশনা অনুযায়ী আমাকে এই মসজিদের গলিতে পাহারায় রেখেছে।

​কিছুক্ষণ পর দেখলাম আওয়ামী লীগ নেতা একরাম বাহিনীর ছত্রছায়ায় থাকা কিছু সন্ত্রাসী ছাত্রদের ওপর হামলা করে। গুলিও করেছে। কিন্তু ছাত্র-জনতার সামনে তারা ১ মিনিটও টিকতে পারেনি। কয়েক সেকেন্ডের প্রতিরোধে তারা পালিয়ে যায়।

ইট-পাটকেল নিক্ষেপে একজন শিবিরকর্মী আহত হয়। তার মাথা থেকে রক্ত ঝরছিল। পরে তাকে কিছু লোক চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলির খোসা আমরা পড়ে থাকতে দেখি।

​শরীরটা ক্লান্ত-শ্রান্ত। সকালে তেমন কিছুই খাওয়া হয়নি। পকেটে অল্প কিছু টাকা ছিল। কিন্তু খাওয়ার জন্য কোনো দোকান কিংবা হোটেল খোলা নেই। ভেতরের গলিতে ছোট একটা ভাতের হোটেল খুঁজে পাই। আমি, রায়হান, মাসুদ ও আরেকজন ভাই (সে কে ছিল মনে করতে পারছি না) আমরা কোনো মতে খাবার খেয়ে নিই।

​অসংখ্য মানুষ খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে আন্দোলনরত ছিল।

​পুরো আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ছাত্রনেতা আরিফুল ইসলাম ভাই। পাশাপাশি কমান্ডারের ভূমিকায় ছিলেন আবু সায়েদ সুমন ভাই। আরও পরিচিত অনেক ভাইকে আন্দোলনে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখেছি।

​জোহরের আজান হয়ে যায়। শিবির নেতাদের দেখলাম রাস্তায় নামাজে জামায়াতবদ্ধ হতে, তাদের সাথে নানা শ্রেণির মানুষও জোহরের নামাজে অংশগ্রহণ করে। আমি মসজিদের দিকে রওনা হই। পথিমধ্যে ধানসিঁড়ি জামায়াতে ইসলামীর আমীর ইব্রাহীম ভাইয়ের সাথে দেখা (সাবেক ছাত্রনেতা)।

এক পর্যায়ে তিনি বললেন, ইদ্রিস ভাই, নামাজ একসাথে মসজিদে আদায় করব, চলেন এখন একটু উত্তর দিকে মানে থানার ওই দিক থেকে ঘুরে আসি। থানার সামনে গিয়ে দেখলাম পুলিশ বাহিনী গেট বন্ধ করে ভেতরে চুপচাপ বসে আছে। আমরা মাইজদী বড় মসজিদে এসে নামাজ পড়ি। নামাজ শেষে একটু বিশ্রাম নিলাম। ছাত্রনেতা গোলাম আজম টিপু ভাই সাথে ছিল। তিনি তখন ছাত্রশিবিরের সদস্য ও দায়িত্বশীল ছিলেন।

তার মারফতে জানতে পারলাম ছাত্রশিবির কঠিন এক সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। ছাত্র-জনতা নিয়ে শেখ হাসিনার গণভবন ঘেরাও করবে। এটা হতে পারে আজ রাত কিংবা আগামীকাল বা পরশু। তবে এটা একদম সিক্রেট। বাহিরে আউট করা যাবে না। তার মুখ থেকে কথাগুলো শুনে মনে প্রশান্তি এল। ইনশাআল্লাহ ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন হবেই হবে।

​পরে আবার রাজপথে ফিরি। কিছু ক্লান্ত-শ্রান্ত যুবককে রাস্তার ওপর এক পাশে বসে থাকতে দেখে বললাম, আপনারা কোন দল থেকে এসেছেন?

তারা বলল, আমরা ছাত্রদল, ছাত্রশিবির বা কোনো রাজনীতি করি না, আমরা নিজ থেকে আন্দোলনে এসেছি।

​সেদিন ছাত্রদল ও ছাত্রদলনেতারা আন্দোলনে সরব ছিল। কিছু কওমি মাদ্রাসার ছাত্রকেও দেখলাম। বিএনপি আইনজীবী সমিতি মিছিলে অংশগ্রহণ করে।

​সেদিন অসংখ্য বোনকে জীবনের মায়া ছেড়ে আন্দোলনে শক্তি জোগাতে দেখেছি।

​সারা দিন এভাবে চলতে থাকে। শত্রুপক্ষের কিছু লোক দূর গলিতে লুকিয়ে থেকে মাঝে মাঝে হামলা করার সুযোগ খুঁজেছে, কিন্তু তারা একটুও সফলতার মুখ দেখেনি। কারফিউ থাকলেও সেটা অকার্যকর ছিলো। বিকালে সেনাবাহিনী এসে আমাদের হাত নেড়ে সাহস জোগায়।

​মাগরিব পর্যন্ত আন্দোলন চলার কথা। নিরাপত্তার কথা ভেবে ছাত্রনেতারা আসরের পরপরই সেদিনের আন্দোলন সমাপ্তি ঘোষণা করেন। সবাই যার যার মতো করে চলে যেতে লাগল। পুরো মাইজদী শহরে কোনো গাড়ি-ঘোড়া নেই। অগত্যা আমরা সোনাপুরের পথে হাঁটা শুরু করলাম। একদিকে সারা দিনের আন্দোলনে ক্লান্ত শরীর, অন্যদিকে কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে যাওয়া।

​হাঁটতে হাঁটতে আমরা দত্তেরহাট বাজার মোড় পর্যন্ত আসি। হঠাৎ সোনাপুরের সিএনজি কামালের নেতৃত্বে কিছু সন্ত্রাসী বাহিনী আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তাদের হাতে দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। তাদের হামলায় আমাদের কিছু ভাই আহত হয়।

​তাদের হামলায় সবাই যার যার মতো শহরের আশেপাশের বিভিন্ন স্থান ও বাড়িতে আশ্রয় নেয়।

​বাদলা দিনের ময়লা-আবর্জনা, স্থানে স্থানে জমে থাকা পানি উপেক্ষা করে আমরা নিরাপদে অবস্থান করি। আমরা ৭-৮ জন একটি বাড়িতে আশ্রয় নিই। আমাদের অবস্থা বিবেচনা করে তারা আতঙ্কিত হয়। প্রথমে বাধা দিলেও পরে বাড়ির লোকজন আমাদের হেল্প করে। কিছুক্ষণ পরে একজন বৃদ্ধা মাকে বললাম, একটু ছাদে গিয়ে দেখেন কেউ আছে কি না এবং পরিবেশ শান্ত হয়েছে কি না। তাঁর পজিটিভ উত্তর পেয়ে বের হয়ে রেললাইনে আসি।

শত শত মানুষ রেললাইনের দিকে চলে আসে। ইতোমধ্যে জানতে পারলাম সন্ত্রাসীরা নাকি ভয় আর আতঙ্কে পালিয়ে গেছে। মানুষকে জিজ্ঞেস করে কবিরহাট যাওয়ার রাস্তা ধরি। পথে নুর ইসলাম জিহাদী ভাইয়ের সাথে দেখা। তিনি তার মোটরসাইকেলে আমাকে ও রায়হানকে তুলে নেন আর মাসুমকে কবিরহাটের সিএনজিতে উঠতে বলেন। শেষে ওনার সাথে এলাকায় চলে আসি।

​সেদিনের বিপ্লবী ও তেজোদীপ্ত স্লোগানগুলো যেন এখনো কানে বাজে—

​"এক দুই তিন চার,

হাসিনা তুই গদি ছাড়।"

​"ছি ছি হাসিনা,

লজ্জায় বাঁচি না।"

​"অ্যাকশন অ্যাকশন,

ছাত্র-জনতার অ্যাকশন।"

​"এক দফা এক দাবি,

হাসিনা তুই কবে যাবি।"

​পরের দিন আন্দোলনে যাব। নির্দেশনা ছিল খুব ভোরবেলা বের হয়ে যেতে হবে। মাসুমের বাড়ি কবিরহাট পৌরসভায় হলেও নিরাপত্তার খাতিরে রাতে গ্রামের বাড়ি চলে আসে।

খুব ভোরবেলা বের হওয়ার কথা থাকলেও আমাদের বের হতে কিছু সময় দেরি হয়ে যায়। তিন ভাই একত্র হলাম। মাসুম এবং রায়হানকে বললাম, আন্দোলনে আজ আর যাওয়ার দরকার নেই। হাতে আর সময় নেই। তারা না যেতে রাজি হলো। আমি আমার প্রতিষ্ঠানের ডিউটিতে চলে যাই।

তারা কোনোভাবে মানতে পারল না যে তাদের অন্য সাথীদের সাথে অংশ না নিয়ে বাড়িতে বসে থাকবে। চাতক পাখির মতো বিপ্লবের তৃষ্ণায় মন ছটফট করে উঠল। তারা ঘর ছেড়ে বাধা উপেক্ষা করে বেরিয়ে যায়। বাড়ি থেকে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে কোম্পানীরহাট। সেখানে ওত পেতে থাকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা।

কোম্পানীগঞ্জের কিছু ছাত্র ছিল। ঘোষবাগ ইউনিয়নের ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম ছাত্র কর্তৃক আহত হওয়ার ভান করে এবং ছাত্রদের সিএনজিতে চুরি পাওয়া গেছে বলে ভুয়া অভিযোগ তোলে। তারা ছাত্রদের ব্যাপক মারধর করে। রায়হান গুরুতর আহত হয়। তাকে কবিরহাট হাসপাতালে পাঠানো হয়।

​ডিউটি শেষে এলাকায় এসে বাড়ি না গিয়ে দোকানে টিভির পর্দার সামনে বসে আছি। বুকটা শুধু ধড়ফড় করছে , কখন জানি বিজয়ের সংবাদ আসে। হঠাৎ শিবিরের সাথী রবিউল ইসলাম কল দিয়ে বলে, ভাইয়া, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে। খবরটা শুনে আনন্দে আত্মহারা। যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না! তাকে পুনরায় বললাম, এটা কি ছাত্রশিবিরের জেলা বা কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছে?

​সে বলল, জি। চারদিক থেকে একের পর এক খবর আসছে, হাসিনা পালিয়ে গেছে। রফিক ভাইয়ের মোটরসাইকেল নিয়ে আনন্দ করতে কবিরহাট বাজারে ছুটে যাই। হাজার হাজার মানুষ আনন্দে মিছিলে নেমে আসে।

চারদিকে খুশির বাঁধভাঙা উল্লাস। জরিপে দেখা গেছে, ওই দিন বাংলাদেশের ৮০% মানুষ দুপুরের খাবার খেতে ভুলে যায়।

​সেদিন বিকেলে আমার সাথে একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটে।

শত শত মানুষ উল্লাস করছে, কিছু মানুষ কবিরহাট শাপলা চত্বরে শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙছে। যথারীতি আনন্দের স্মৃতিগুলো রেখে দিতে ভিডিও করছি। কিছু লোক আমার ওপর চড়াও হয় এবং আমার মোবাইলটা নিয়ে নিতে চায়।

অথচ তাদের জুলাই আন্দোলনে কখনো দেখিনি। ইতোমধ্যে একজন পরিচিত মানুষ ভাতিজা বলে আমাকে জড়িয়ে ধরে। সে ছিল তাদেরই দলীয় লোক। ওই লোককে বিষয়টা বলতে না বলতে ওরা মোবাইলটা ফিরিয়ে দেয়। আরেকজন জুলাই যোদ্ধার সাথেও এমন একটা ঘটনা ঘটেছে।

​মিছিল শেষে সিএনজি করে হালিমের মোকাম এসে পৌঁছে দেখি— কিছু যুবক বাক্‌বিতণ্ডা শুরু করেছে। তারা তাদের দলে কে কত অবদান রেখেছে সেটার ক্রেডিট নিতে ঝগড়া করে। কিছুটা অবাক হলাম। আজ তো আনন্দের দিন, আজ তো দেশকে নতুন করে সাজানোর দিন। এভাবে আজই ভাগাভাগি শুরু করলে সামনের দিনগুলো শুভকর হবে না।

​যা-ই হোক, অবশেষে এলাকায় এসে অজু করে মসজিদে গিয়ে প্রাণ ভরে দুই রাকাত শুকরিয়ার নফল নামাজ আদায় করি। মহান রবের দরবারে অগণিত শুকরিয়া। মুখ থেকে অকপটে বারবার উচ্চারিত হতে লাগল, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ।

নামঃ ইদ্রিস হাসান

ঠিকানাঃ ৪নং ঘোষবাগ ইউনিয়ন, কবিরহাট,নোয়াখালী।

মোবাইলঃ 01860791753

Comments (0)

Be the first to comment on this article.


Leave a comment

Your comment will be reviewed before publication.