ঢাকা    ,

মানব যখন দানব

মানব যখন দানব

মানব যখন দানব

মানুষ যখন মানবিকতা হারায়, তখন তার চেয়ে ভয়ংকর আর কিছু হয় না। আজ সমাজে শিশু গুম ও হত্যা, নারী নির্যাতন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড, পারিবারিক সহিংসতা এবং নানা ধরনের অপরাধের যে ভয়াবহতা দেখা যাচ্ছে, তা শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের গভীর সংকট।

নগণ্য বিষয় কখনো কখনো জঘন্য পরিণতি ডেকে আনছে। সামান্য মতবিরোধে সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে, ক্ষোভ রূপ নিচ্ছে প্রতিহিংসায়, আর পেশিশক্তি ও প্রভাবের কাছে দুর্বল মানুষ হয়ে পড়ছে অসহায়। আইনের যথাযথ প্রয়োগে ঘাটতি, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, অনিয়মকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাব সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো—অন্যায় দেখেও অনেক সময় সমাজ নীরব থাকে।

ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার অবহেলাও এই সংকটকে গভীর করছে। ধর্ম কেবল আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়; ধর্ম মানুষের মধ্যে সংযম, ন্যায়, দায়িত্ববোধ, মমতা ও অপরের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়। সেই মানবিক শিক্ষা যদি জীবনে প্রতিফলিত না হয়, তবে ধর্মীয় পরিচয়ও সমাজকে নৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে না।

এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু কঠোর আইন নয়, প্রয়োজন মানুষের বিবেক জাগ্রত করা। পরিবারকে হতে হবে নৈতিক শিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান। শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি মানবিকতা, যুক্তিবোধ, সহনশীলতা ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটাতে হবে। গুজব, কুসংস্কার, অন্ধ আনুগত্য ও বিদ্বেষের পরিবর্তে সত্য, যুক্তি ও প্রমাণের চর্চা বাড়াতে হবে।

একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে আইনের সমান প্রয়োগ। অপরাধীর পরিচয়, দল, অর্থ কিংবা প্রভাব নয়—অপরাধের প্রমাণই হবে বিচারের ভিত্তি। নিরপরাধ মানুষের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি অপরাধীরও আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা। ভালোবাসা, আন্তরিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার বন্ধন যত শক্তিশালী হবে, সমাজ তত নিরাপদ হবে। অন্যের বিপদকে নিজের বিপদ মনে করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

কারণ সভ্যতা শুধু আধুনিক প্রযুক্তি, উঁচু ভবন কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়নের নাম নয়। সভ্যতা হলো—একটি শিশু নিরাপদে বেড়ে উঠবে, একজন নারী মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে, দুর্বল মানুষ শক্তিশালীর ভয়ে কাঁপবে না এবং অন্যায় হলে মানুষ ন্যায়বিচারের আশ্রয় পাবে।

মানুষকে দানব থেকে আবার মানুষে ফিরিয়ে আনাই আজকের সবচেয়ে বড় সামাজিক দায়িত্ব। আর সেই পরিবর্তনের শুরু হোক নিজের বিবেক থেকে, পরিবার থেকে এবং আমাদের প্রত্যেকের আচরণ থেকে।

মোহাম্মদ উল্যা মিরাজ

শিক্ষক সাংবাদিক লেখক

Comments (0)

Be the first to comment on this article.


Leave a comment

Your comment will be reviewed before publication.