আইনের ফাঁক, নাকি সামাজিক পতন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বশীলদের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন
চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমনে ওসি-এসপির দৃঢ় অবস্থান কতটা কার্যকর? আইনের যথাযথ প্রয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশি ব্যবস্থা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাবই কি অপরাধ বিস্তারের অন্যতম কারণ?
শাহাদাত হোসেন
বার্তা সম্পাদক,
নবজ্যোতি।
আইন আছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আছে, অপরাধ দমনে রয়েছে নানা বিধিবিধান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা। তারপরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সাধারণ মানুষের ওপর নানা ধরনের হয়রানির অভিযোগ উঠছে। কোথাও প্রকাশ্যে, কোথাও নেপথ্যে অপরাধের এমন বিস্তারে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, সমস্যাটি কি আইনের দুর্বলতা, নাকি আইন প্রয়োগে দায়িত্বশীলদের সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি?
একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কিংবা একটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) যদি অপরাধ দমনে আন্তরিক, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং আপসহীন হন, তাহলে নিজ নিজ এখতিয়ারের মধ্যে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধের ক্ষেত্র অনেকটাই সংকুচিত করা যায়।
তবে বাস্তবতা হলো, কোনো এলাকায় অপরাধ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া শুধু একজন ওসি বা এসপির ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রশাসনিক সক্ষমতা, জনবল, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপ, বিচারিক প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং অপরাধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উৎস। তাই অপরাধ দমনের প্রশ্নে ব্যক্তিগত সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সদিচ্ছা থাকলে কি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয় অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা, চাঁদাবাজির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা তাঁদের দায়িত্বের অংশ।
একজন দায়িত্বশীল ওসি যদি থানায় আসা অভিযোগকে অবহেলা না করেন, ভুক্তভোগীকে হয়রানির শিকার হতে না দেন এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির পরিচয় বা প্রভাবকে বিবেচনায় না নিয়ে ব্যবস্থা নেন, তাহলে অপরাধীদের মধ্যে আইনের প্রতি ভয় তৈরি হতে পারে। একইভাবে, একজন এসপি যদি অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করেন এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা কিংবা অসদাচরণের অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করেন, তাহলে পুরো জেলার আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
অন্যদিকে, অভিযোগ গ্রহণে অনীহা, অপরাধীদের প্রতি নমনীয়তা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা কিংবা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা অপরাধীদের উৎসাহিত করতে পারে। তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে তা প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তাহলে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বন্ধ হচ্ছে না কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর একক কোনো কারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অপরাধের বিস্তারের পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রথমত, আইনের অসম প্রয়োগের ধারণা। সাধারণ অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও প্রভাবশালী বা সংগঠিত অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হলে জনমনে বৈষম্যের ধারণা তৈরি হয়। এতে আইনের প্রতি আস্থা দুর্বল হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব। কোনো অপরাধী যদি রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিংবা স্থানীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে আইনগত ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে অপরাধের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশকে আইনানুগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন দেওয়া জরুরি।
তৃতীয়ত, দুর্বল তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। অপরাধের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হলে, সাক্ষীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে কিংবা বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে অপরাধ দমনের কার্যকারিতা কমতে পারে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, আইনসম্মত তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও অপরাধ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চতুর্থত, সামাজিক নীরবতা ও ভয়ের সংস্কৃতি। চাঁদাবাজির শিকার হয়েও অনেকে প্রতিশোধের আশঙ্কায় অভিযোগ করতে চান না। আবার কোথাও অপরাধের সঙ্গে আপস করে চলাকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপায় হিসেবে দেখা হয়। ফলে অপরাধের প্রকৃত চিত্র সামনে আসে না এবং অপরাধীরা আরও সাহস পেতে পারে।
পঞ্চমত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। বেকারত্ব, বৈধ কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, অপরাধনির্ভর স্থানীয় প্রভাববলয় এবং অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এসব কারণ অপরাধকে বৈধতা দেয় না; বরং অপরাধ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
আইনের ফাঁক, নাকি প্রয়োগের দুর্বলতা?
চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের মতো অপরাধ দমনে বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কোনো অপরাধের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত, প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধে সহায়তা পাওয়া যায়।
কিন্তু আইন থাকলেই অপরাধ বন্ধ হয়ে যায় না। আইনের প্রয়োগে ধারাবাহিকতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহি থাকতে হয়। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে একই মানদণ্ডে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নীতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগ, হয়রানিমূলক মামলা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে নাগরিকদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অতএব,সমস্যাটিকে শুধু আইনের ফাঁক হিসেবে দেখা যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি সব দায় ব্যক্তিগত সদিচ্ছার অভাবের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও বাস্তবসম্মত নয়। কোথাও আইনের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কোথাও প্রয়োগে ঘাটতি থাকতে পারে, আবার কোথাও অপরাধ দমনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার অভাব থাকতে পারে।
জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি!
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একটি এলাকায় চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসের অভিযোগ কতটি এসেছে, কতটি তদন্ত হয়েছে, ভুক্তভোগীরা কতটা নিরাপত্তা পেয়েছেন এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এসব বিষয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে থানায় অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করা, অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষা, পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও গণমাধ্যমও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবে অপরাধ দমনের নামে নির্বিচার গ্রেপ্তার, হয়রানি কিংবা বিচারবহির্ভূত পন্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং একই সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত রাখা।
সামাজিক অবক্ষয় রোধেও প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ!
চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এগুলো অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনআস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে, সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তার জন্য প্রভাবশালীদের ওপর নির্ভর করতে হলে কিংবা ভুক্তভোগী বিচার চাইতে ভয় পেলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পুলিশ ও প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব রয়েছে। অপরাধকে প্রশ্রয় না দেওয়া, অপরাধীদের সামাজিকভাবে বৈধতা না দেওয়া, নিরাপদ উপায়ে অভিযোগ জানানো এবং ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
একজন সৎ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ওসি কিংবা এসপি একটি এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁর নেতৃত্বে অপরাধ দমনের উদ্যোগ গতিশীল হতে পারে, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তে পারে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ব্যক্তিগত সদিচ্ছাকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপ দিতে হবে।
প্রশ্নটি তাই শুধু এই নয় যে, একজন ওসি বা এসপি চাইলে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমন করতে পারবেন কি না। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কি না, অপরাধীর পরিচয় নির্বিশেষে আইন প্রয়োগ করা হবে কি না এবং ভুক্তভোগী নির্ভয়ে ন্যায়বিচার চাইতে পারবেন কি না।
পরিশেষে বলবো, শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই, যখন আইন কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে না, দায়িত্বশীলদের সদিচ্ছা বাস্তব পদক্ষেপে প্রতিফলিত হয় এবং অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়। তাই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে প্রয়োজন সদিচ্ছা, সাহসী নেতৃত্ব, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়।
অপরাধ দমনে সদিচ্ছা প্রয়োজন, কিন্তু সেই সদিচ্ছাকে কার্যকর ও টেকসই করে আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচার।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment