ঢাকা    ,

কোম্পানীগঞ্জে ক্ষমতার রাজনীতির নতুন সমীকরণ, বিরোধী দলের অবস্থান কী?

কোম্পানীগঞ্জে ক্ষমতার রাজনীতির নতুন সমীকরণ, বিরোধী দলের অবস্থান কী?

কোম্পানীগঞ্জে ক্ষমতার রাজনীতির নতুন সমীকরণ, বিরোধী দলের অবস্থান কী?

শাহাদাত হোসেন

বার্তা সম্পাদক,নব জ্যোতি:

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই জেলার রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। একসময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই উপজেলায় ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতার ভারসাম্যে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন।

বিশেষ করে, বসুরহাট কেন্দ্রিক রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের উত্থান, দলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন সব মিলিয়ে কোম্পানীগঞ্জের রাজনীতি এখন নতুন এক সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট ও সদর উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর বেলায়েত হোসেন পান ১ লাখ ২০ হাজার ৪৫৩ ভোট। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের প্রভাবাধীন থাকা এই নির্বাচনী এলাকায় ফলাফলটি স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের দুর্বলতা, বিএনপির উত্থান:

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকায় দলটির প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও সীমিত। ফলে দীর্ঘদিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সামনে সাংগঠনিকভাবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে রাজনৈতিক মাঠে কোনো একটি দলের দুর্বলতা কিংবা ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলেই যে অন্য একটি দল স্বয়ংক্রিয়ভাবে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে কোম্পানীগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তা বলছে না। বরং বিএনপির মধ্যেই নেতৃত্ব, কমিটি গঠন এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ ও অসন্তোষের বিষয়টি সামনে এসেছে।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব:

সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও বসুরহাট পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে দলটির নেতা-কর্মীদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। অসন্তুষ্টদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মতামত যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি। তবে জেলা বিএনপির নেতারা এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছেন, দলের হাইকমান্ডের পরামর্শ অনুযায়ী ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

একইভাবে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদল ও বসুরহাট পৌরসভা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি নিয়েও নেতা-কর্মীদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষের খবর পাওয়া গেছে। তাদের অভিযোগ, কমিটি গঠনে তৃণমূলের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। অন্যদিকে দলীয় নেতাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কেন্দ্র ও দলের সংশ্লিষ্ট নেতাদের পরামর্শের ভিত্তিতেই কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এর আগেও দলীয় কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে কোম্পানীগঞ্জ বিএনপিতে অসন্তোষের নজির রয়েছে। মওদুদ আহমদের সময়ে দেওয়া একটি কমিটি নিয়েও স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একটি অংশ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছিল এবং তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে কমিটি গঠনের দাবি তুলেছিল।

এতে স্পষ্ট যে, বিএনপির সামনে এখন শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করাই চ্যালেঞ্জ নয়; নিজেদের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং তৃণমূলের প্রত্যাশা সমন্বয় করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্ষমতার রাজনীতির নতুন কেন্দ্রবিন্দু:

কোম্পানীগঞ্জের ক্ষমতার রাজনীতি এখন শুধু নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। দলীয় কমিটি, স্থানীয় সংগঠন, সামাজিক প্রভাব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতাও স্থানীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় একটি হাসপাতাল দখলের চেষ্টার অভিযোগ এবং এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মতো ঘটনাও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অভিযোগ ব্যবহারের প্রবণতা থাকলে তাতে স্থানীয় রাজনীতিতে বিভাজন আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে ২০২৫ সালেও কোম্পানীগঞ্জে বিএনপিতে আওয়ামী লীগের কিছু নেতার যোগদানের চেষ্টা কিংবা রাজনৈতিক পুনর্বাসনের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে দলের তৃণমূলে পুরোনো রাজনৈতিক পরিচয়, নতুন যোগদানকারী এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিরোধী দলের ভূমিকা কতটা কার্যকর?

কোম্পানীগঞ্জে বিরোধী দলের ভূমিকা বর্তমানে প্রধানত তিনটি স্তরে দৃশ্যমান, যেমন- সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা, মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক বিস্তার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে কর্মসূচি পালন।

২০২৬ সালের জুনে নোয়াখালী সদরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার প্রতিবাদে কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। এসব কর্মসূচি থেকে বিএনপি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।

তবে একটি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা শুধু প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা কিংবা প্রতিবাদ কর্মসূচির ওপর নির্ভর করে না। স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা হলো,আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, নদীভাঙন এবং স্থানীয় উন্নয়নসহ জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেও রাজনৈতিক দলগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

অর্থাৎ বিরোধী দলের শক্তি শুধু মিছিল-মিটিংয়ে নয়; জনগণের সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে কার্যকর চাপ সৃষ্টি এবং বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচি উপস্থাপনেও তার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হয়।

জামায়াতের উপস্থিতিতে নতুন সমীকরণ কি?

নোয়াখালী-৫ আসনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোম্পানীগঞ্জসহ পুরো নির্বাচনী এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলেও জামায়াতের প্রার্থীও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট পেয়েছেন।

ফলে ভবিষ্যৎ স্থানীয় রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পারস্পরিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মাঠপর্যায়ের ভোটের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দলের অবস্থান, তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি এবং ভোটারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

এর পাশাপাশি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কমিটি নিয়ে অসন্তোষও দলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে বসুরহাট পৌর ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে নেতা-কর্মীদের একটি অংশের পুনর্বিবেচনার দাবি দলটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ:

কোম্পানীগঞ্জে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো,নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি অতীতের সংঘাতনির্ভর রাজনীতির বাইরে গিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে পারবে?

বিশ্লেষণ করলে বিএনপির সামনে অন্তত কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমত, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ন্ত্রণ করা।

দ্বিতীয়ত, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পদ-পদবি ও নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ কমানো।

তৃতীয়ত, সুবিধাবাদী অনুপ্রবেশের অভিযোগ মোকাবিলা করা।

চতুর্থত, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়িয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখা।

একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানও কোম্পানীগঞ্জের রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তাদের পুরোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে,৷ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওই নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে কীভাবে সক্রিয় হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

পরিশেষে বলবো, সব মিলিয়ে কোম্পানীগঞ্জের রাজনীতি এখন একটি পরিবর্তনশীল সন্ধিক্ষণে। দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগ-প্রধান রাজনৈতিক কাঠামোর জায়গায় বিএনপির প্রভাব বাড়লেও সেটি এখনো পুরোপুরি নিরঙ্কুশ নয়। বিএনপির উত্থানের পাশাপাশি দলটির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী উপস্থিতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে।

কোম্পানীগঞ্জের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দলগুলো কতটা রাজনৈতিক সহনশীলতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে তার ওপর।

ক্ষমতার পালাবদল যদি কেবল এক পক্ষের আধিপত্যের পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার পথ তৈরি করে, তাহলেই এই পরিবর্তন স্থানীয় মানুষের জন্য অর্থবহ হয়ে উঠবে।

আর যদি পুরোনো সংঘাতের সংস্কৃতি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে ফিরে আসে, তাহলে শুধু রাজনৈতিক দলের নাম ও নেতৃত্ব বদলাবে,কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত পরিবর্তন অধরাই থেকে যাবে।

Comments (0)

Be the first to comment on this article.


Leave a comment

Your comment will be reviewed before publication.