চরহাজারী ১নং ওয়ার্ড প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ও শিক্ষার আলোয় এগিয়ে চলা এক শান্তিপ্রিয় জনপদ
ইমাম হোসেন সোহেল:
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৩নং চরহাজারী ইউনিয়নের পশ্চিম চরহাজারীর প্রবেশদ্বার যেন ১নং ওয়ার্ড। ভৌগোলিকভাবে ছোট্ট একটি জনপদ হলেও জনসংখ্যা, প্রবাসী অধ্যুষিত পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সম্প্রীতির দিক থেকে এ ওয়ার্ডটির রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি।
চরহাজারী ১নং ওয়ার্ডের পশ্চিমে বসুরহাট পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড, দক্ষিণে বসুরহাট পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড, উত্তরে চরপার্বতী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড এবং পূর্বে চরহাজারী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড।এ চার সীমানার মধ্যেই গড়ে উঠেছে চরহাজারী ১নং ওয়ার্ডের জনপদ।
স্থানীয়ভাবে এটি ১৪নং মৌজার অন্তর্ভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। ছোট্ট এই ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে প্রায় ৭ হাজার মানুষের বসবাস। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রণীত ভোটার তালিকা অনুযায়ী এ ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৫০০।
চরহাজারী ১নং ওয়ার্ডের অর্থনৈতিক জীবনে প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ওয়ার্ডের বহু মানুষ জীবিকার তাগিদে দেশের সীমানা পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন।সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুরে কর্মরত রয়েছেন এ এলাকার অনেকে।
ইউরোপের ইতালি ও জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও চরহাজারীর মানুষ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পরিবারের আর্থিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে অনেক পরিবার যেমন স্বাবলম্বী হচ্ছে, তেমনি সন্তানদের শিক্ষা, ঘরবাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চরহাজারী ১নং ওয়ার্ডে রয়েছে ৫টি জামে মসজিদ ও ১টি পাঞ্জেগানা মসজিদ। এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা নিয়মিত নামাজ ও ইবাদত-বন্দেগি পালন করেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এখানকার সামাজিক পরিবেশ।
শিক্ষাক্ষেত্রেও চরহাজারী ১নং ওয়ার্ডের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ওয়ার্ডে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদরাসা। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এলাকার শত শত শিশু-কিশোর শিক্ষা গ্রহণ করছে।তবে এ ওয়ার্ডের অন্যতম বিশেষত্ব হলো কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার একমাত্র কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিভিটিসি টেকনিক্যাল স্কুল এখানেই অবস্থিত। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি কারিগরি শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
দীর্ঘ পথচলায় এখান থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন।
চরহাজারী ১নং ওয়ার্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো জৈতুন নাহার কাদের মহিলা কলেজ। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার একমাত্র মহিলা কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি নারীশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
২০১০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি এলাকার নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে আসছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নারীশিক্ষার প্রতি পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধিতেও প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য শান্তিপ্রিয়তা ও পারস্পরিক সহযোগিতা। চরহাজারী ১নং ওয়ার্ডের মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানকার মানুষ সাধারণভাবে শান্তিপ্রিয় এবং সামাজিক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী।এলাকার কোনো মানুষ বিপদে পড়লে অন্যরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। পারস্পরিক সহমর্মিতা, সামাজিক বন্ধন ও একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা এ জনপদের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক ঐতিহ্য হিসেবে গড়ে উঠেছে।
ভৌগোলিক আয়তনে ছোট হলেও প্রবাসী জনগোষ্ঠী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় পরিবেশ এবং সামাজিক সম্প্রীতির কারণে চরহাজারী ১নং ওয়ার্ডের রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। প্রবাসীদের অর্জিত অর্থ, শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম এবং বিদ্যমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে এ ওয়ার্ড ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ ও আধুনিক জনপদে পরিণত হতে পারে।
সব মিলিয়ে চরহাজারী ১নং ওয়ার্ড শুধু একটি প্রশাসনিক ওয়ার্ড নয়,এটি প্রবাসীদের শ্রম, শিক্ষার আলো, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতায় গড়ে ওঠা একটি শান্তিপ্রিয় জনপদ যার রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার গল্প।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment