কোম্পানীগঞ্জে ডেঙ্গু: দায় কার, প্রতিরোধে ঘাটতি কোথায়?
"আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবরের পরও প্রশ্ন মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর স্থানীয় উদ্যোগ?"
শাহাদাত হোসেন
বার্তা সম্পাদক
"মাসিক নব জ্যোতি":
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক যুবকের মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্কও বেড়েছে। তবে পরিস্থিতি এখন শুধু আক্রান্তের সংখ্যা কিংবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামনে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, স্বাস্থ্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যার যার দায়িত্ব কতটা পালন করছে?
ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত রোগ। আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা যেমন জরুরি, তেমনি রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, লার্ভা শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করা। এসব কার্যক্রমে ঘাটতি থাকলে শুধু হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব কি শুধু চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ?
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব শুধু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রোগ শনাক্তকরণ, রোগীর তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে সেখান থেকে একটি বিষয় দ্রুত জানা প্রয়োজন।রোগীরা কোন কোন এলাকা থেকে আসছেন, কোথায় আক্রান্তের ঘনত্ব বেশি, ওই এলাকায় মশার প্রজননস্থলের অবস্থা কী এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এসব তথ্য নিয়মিতভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলে জনগণও স্থানীয় ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতেন এবং নিজেদের করণীয় নির্ধারণ করতে পারতেন।
বসুরহাট পৌরসভার ভূমিকা কতটা কার্যকর?
কোম্পানীগঞ্জের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বসুরহাট পৌরসভার ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শহরাঞ্চলের ড্রেন, জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, আবর্জনা ও অপরিচ্ছন্ন জায়গা এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বসুরহাট পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর খবর পাওয়া যায়। ওই সময় বাসস্ট্যান্ড, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন বাসাবাড়ির আশপাশ ও ড্রেন পরিষ্কার করা হয়। পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এ ধরনের অভিযান কতটা নিয়মিত? নাকি ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পরই কেবল দৃশ্যমান কর্মসূচি নেওয়া হয়?
কারণ একদিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান দিয়ে এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন ওয়ার্ডভিত্তিক নিয়মিত পরিদর্শন, লার্ভা শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা এবং শনাক্ত হওয়া প্রজননস্থলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
ইউনিয়ন পর্যায়েও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
কোম্পানীগঞ্জ শুধু বসুরহাট পৌরসভা নিয়ে গঠিত নয়। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করেন। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
কোনো ইউনিয়নে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে সেখানে বাড়ি বাড়ি সচেতনতা, সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ এবং স্থানীয়ভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না এ প্রশ্নের উত্তরও জনগণের জানা দরকার।
শুধু শহরকেন্দ্রিক কার্যক্রম দিয়ে পুরো উপজেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। গ্রাম, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলেও সমানভাবে নজরদারি প্রয়োজন।
প্রশাসনের সমন্বয় ও জবাবদিহি কোথায়?
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয় ছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম অনেক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি সমন্বিত ডেঙ্গু প্রতিরোধ পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। কোন এলাকায় কতজন আক্রান্ত, কোথায় মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেছে, কোন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান হয়েছে এবং কোথায় পুনরায় অভিযান প্রয়োজন এসব তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের সরকারি কাঠামোতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় প্রশাসনিক সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।
রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও দায় আছে
ডেঙ্গু কোনো দলীয় সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের বিষয়। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বও শুধু বক্তব্য বা কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা চাইলে ওয়ার্ড ও ইউনিয়নভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারেন। বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে সমন্বয় করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
রাজনৈতিক প্রভাব ও জনসম্পৃক্ততাকে যদি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে কাজে লাগানো যায়, তাহলে সেটিই হতে পারে জনস্বার্থে কার্যকর রাজনৈতিক ভূমিকা।
দায় কি শুধু প্রশাসনের?
ডেঙ্গুর দায় পুরোপুরি প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে দিলেও বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। কারণ বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ড্রাম, বালতি, নির্মাণসামগ্রী কিংবা অন্য কোনো পাত্রে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতেও এডিস মশার প্রজনন হতে পারে।
তাই নিজেদের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং পানি জমতে না দেওয়ার দায়িত্ব নাগরিকদেরও রয়েছে।
তবে নাগরিকের দায়িত্ব আছে বলেই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং নাগরিক সচেতনতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগ এবং সরকারি ব্যবস্থাপনা সবগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রতিরোধের আগে কেন সতর্কতা নয়?
২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও কোম্পানীগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার খবর পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ ডেঙ্গুর ঝুঁকি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট মহল আগে থেকেই অবগত ছিল।
এরপরও ২০২৬ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। ফলে এখন শুধু নতুন করে অভিযান চালানোই যথেষ্ট নয়; আগের উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
কোন এলাকায় মশার প্রজননস্থল শনাক্ত হয়েছিল? সেগুলো ধ্বংসের পর পুনরায় পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না? আক্রান্তের তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল কি না? নিয়মিত মশক জরিপ বা লার্ভা শনাক্তকরণ কার্যক্রম কতটা হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।
শুধু ‘সচেতন হোন’ এ ধরনের প্রচারণা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের বাস্তব কার্যক্রম এবং তার ফলাফল প্রকাশ করা।
দায় নির্ধারণের চেয়ে দায়িত্ব নির্ধারণ জরুরি
কোম্পানীগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় দায় একক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়। এটি মূলত একটি সমন্বিত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পরীক্ষা।
স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব - দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, রোগ নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সম্পর্কে তথ্য দেওয়া।
উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্ব - সব পক্ষকে সমন্বয় করে কার্যকর পরিকল্পনা, তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
পৌরসভার দায়িত্ব - ড্রেন, আবর্জনা ও জনসমাগমস্থল পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।
ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব - গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা।
জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব - জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং মাঠপর্যায়ের সমস্যা প্রশাসনের নজরে আনা।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব - দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বাস্থ্য সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখা।
নাগরিকদের দায়িত্ব - বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
পরিশেষে বলবো, কোম্পানীগঞ্জে ডেঙ্গু নিয়ে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন শুধু ‘দায় কার?’ নয়; বরং ‘কে কী দায়িত্ব পালন করেছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে?’
একজন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে তার আগেই যদি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা যায়, আক্রান্তের হটস্পট চিহ্নিত করা যায় এবং নিয়মিত মাঠপর্যায়ে নজরদারি চালানো যায়, তাহলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তাই ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পর দায় চাপানোর রাজনীতি নয় প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, নিয়মিত মশক নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।
কোম্পানীগঞ্জের মানুষ এখন সেটিই দেখতে চায়, ডেঙ্গু বাড়ার পর অভিযান নয়, ডেঙ্গু বাড়ার আগেই প্রতিরোধ।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment