দাগনভূঞা উপজেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহি খেজুর গাছের রস :
এম.এম.রহমান সোহেল:
দাগনভূঞা উপজেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহি খেজুর গাছ। পাওয়া যাচ্ছেনা খেজুরের রস। বদলে
যাচ্ছে সব কিছু,গত দুই যুগ পূর্বেও গ্রামের রাস্তার পাশে,খাল পাড়ে ,নদীর ধারে, বিভিন্ন জায়গায় এ গাছ দেখা যেত।
চিরন্তন রূপ এ বাংলার একটা সময় শীত মৌসুমে গ্রামে খেজুর রস আহরণের ধুম পড়ে যেত। তবে সেই দিনগুলো এখন অনেকটাই স্মৃতি। অবাধে খেজুর গাছ নিধন
এবং পেশাদার গাছি সংকটে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলাতেও খেজুর রস ও রসের তৈরি ঐতিহ্যবাহী রাব (খেজুরের কাঁচা রস আগুনে জ্বাল দিলে গাঢ়ত্ব হলে তাকে নোয়াখালী /ফেনীর ভাষায় রাব বলে) বিলুপ্ত হতে চলেছে।
ধীরে ধীরে শীত যত বাড়ছে, খেজুরের রসের গুরুত্ব তত বাড়ছে। কিন্তু এলাকায় গাছ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।এক সময় শীতের কুয়াশার সকালে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকা দেখা যেতো , এই ঘন কুয়াশার মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় থেকে পান ,চিড়া- মুড়ির মোল্লা নিয়ে বিভিন্ন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ছুটে আসতো রসের
পিঠাসহ।এসব ছিল গ্রামের মানুষের সকালের নাস্তার প্রধান উপাদান।এই কাঁপানো শীতে মিষ্টি খেজুরের রস, যার স্বাদ ও ঘ্রাণ আলাদা। আল্লাহর দানীয় এই নেয়ামত গাছের রস দিয়ে রান্না করা পায়েস ছিল যেমন সুস্বাদু তেমনি স্বাস্থ্যকর।
খেজুর গাছের বৈশিষ্ট্য হলো, শীত যত বাড়বে রস তত মিষ্টি হবে। হাড় কাঁপানো শীতকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন উপজেলা থেকে তরুণ ব্যবসায়ীরা গাছিদের থেকে খেজুরের রস সংগ্রহ করেন।
তরুণ ব্যবসায়ী মানবিক সংগঠক মােঃ আবদুল হান্নান জানায়, দাগনভূঞা পর্যাপ্ত খেজুর গাছ না থাকায় আমি সোনাগাজী থেকে গাছিদের কাছ থেকে রস সংগ্রহ করে ফেনী জেলার এই অঞ্চলে এ কোমল পানীয় সু স্বাদু রস পৌঁছে দিচ্ছি।
তবে চাহিদার তুলনায় কম দিতে হচ্ছে,কারন এটি সারা বছর পাওয়া যায় না,বিধায় সিজনের সময় সবার আগ্রহ তৈরি হয় ।তিনি আরও বলেন, আমরা অনলাইনে অর্ডার নেয়া এবং ব্যবসা
করার কারনে আরও চাহিদা বেড়ে গেছে। ইঞ্জিনিয়ার ইয়াকুব বলেন,আমরা ছোট বেলায় দেখেছি
শীত এলে খেজুরের রস সংগ্রহ শুরু হয়। শীতের সকালে রসের তৈরি বিভিন্ন পিঠা পায়েস দিয়ে সকালের নাস্তা হতো এখন সে রকম দেখা যায় না।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়,দাগনভূঞা উপজেলাতে তেমন খেজুর গাছ চোখে পড়েনা। কারণ এ গাছ কেউ চাষ করে না, বেশির ভাগ প্রাকৃতিক ভাবে জন্মায় সে গুলো রক্ষা এবং পরিচর্যার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। এক সময় এই উপজেলা খেজুর গাছে সমৃদ্ধ ছিল।গাছ থেকে শীত মৌসুমে কাঁচা রস ও রসের তৈরি রাব উৎপাদন হতো।
আগে গাছিরা খেজুর গাছ কেটে যে রস পেত, তার অর্ধেক মালিককে দিত। এখন অনলাইন ব্যবসায়ীরা গাছিকে কিনে নিয়ে আসে এবং ৭০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত রসের লিটার বিক্রি করেন। এই পেশায় জড়িত গাছিরা রস আহরণে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে।
এক সময়ের এক গাছি গোফরান বলেন, শীত আসা মাত্রই আমরা খেজুর গাছ ছিলানোর জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লেগেই থাকতাম।
তিনি আরোও বলেন,নিজেদের প্রয়োজনীয় খাবারের চাহিদা মিটিয়ে বাকিটা বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যেতো তা দিয়ে সংসার চালতো।আমরা শীত আসার আগে আগে গাছ কাটার জন্য খুন্তি, দা, ঠুঙি,দড়ি ও মাটির কলস কেনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম।
পোলার হাটের কালাম বলেন,আগের মতো খেজুর গাছ আর নেই। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই গাছগুলো। সরকারি /বেসরকারি ভাবে এ গাছের চারা উৎপাদন, গাছ লাগানোর নেই কোনো উদ্যেগ।
স্থানীয়রা বলছেন, খেজুর রস ও রাবকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার করতে হলে প্রাচীন গাছ গুলো রক্ষা করতে হবে এবং নতুন নতুন গাছ লাগাতে হবে।না হলে আর কিছু দিন গেলে এ উপজেলা হতে খেজুর গাছ, রস ও রাবের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না।
দাগনভূঞা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, তাল এবং খেজুর গাছ পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেউ খেজুর গাছ রোপন করতে চাইলে আমরা চারা গাছ সংগ্রহ করে দিতে পারবো।খেজুর
রস পেতে হলে সবার আগে গাছ সংরক্ষণ করতে হবে। গ্রামে কেউ খেজুর গাছ লাগাতে চায় না। খেজুর রস কিংবা রাব পেতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গাছ লাগাতে হবে।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment