আল ফালাহ ফরায়েজিয়া দাখিল মাদরাসার সরকারি ভাবে পাঠদানে অনুমতি ২৩ বছরের স্বপ্নপূরন এলাকায় আনন্দের জোয়ার :
মোঃ আল এমরান :
নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ২ নং চরপার্বতী ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ড মৌলভীবাজার সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত আল ফালাহ ফরায়েজিয়া দাখিল মাদরাসা অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারিভাবে পাঠদানের অনুমতি লাভ করেছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। দীর্ঘ ২৩ বছরের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা, ত্যাগ ও প্রত্যাশার পর গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখে বাংলাদেশ কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এর প্রজ্ঞাপন স্মারকের মাধ্যমে মাদরাসাটি পাঠদানের অনুমোদন পায়।
এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় আনন্দের বন্যা বইতে থাকে। এই ঐতিহাসিক অর্জনকে ঘিরে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকাল ১১টায় মাদরাসা প্রাঙ্গণে এক শোকরানা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
পুরো আয়োজন জুড়ে ছিল কৃতজ্ঞতা, আবেগ, আনন্দ ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন। ২০০৩ সালের ১ জানুয়ারি আমেরিকা প্রবাসী বিশিষ্ট সমাজসেবক হাজ্বী আব্দুল মন্নান সাহেবের একান্ত উদ্যোগ ও নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয় এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
শুরুর দিনগুলো ছিল সংগ্রামের,অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি “হাঁটি হাঁটি পা পা” করে এগিয়ে গেছে।
মাদরাসার বর্তমান কার্যকরী কমিটির সভাপতি প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম মানিকের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও নিরলস পরিশ্রম এই অনুমতি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিয়মিত যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রণয়ন ও সার্বিক তদারকির মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
মাদরাসার প্রধান মাওলানা নুর মোহাম্মদ এবং চরহাজারী মহিলা মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা ফরিদ উদ্দিন নুরীর সহযোগিতাও ছিল প্রশংসনীয়। তাঁদের দিকনির্দেশনা ও একাডেমিক তত্ত্বাবধান প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
ইতিপূর্বে ২০২৫ সালে এ মাদরাসা থেকে দুইজন শিক্ষার্থী এ-প্লাস অর্জন করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি করে। তাদের মধ্যে একজন শামীমুন নাহার ইমু, মাসিক “নব জ্যোতি” পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ আল এমরানের কন্যা। অপরজন সৌদি আরব প্রবাসী জসিমের পুত্র মোঃ নাজিম উদ্দিন। তাদের এ সাফল্য প্রমাণ করে,সুবিধা সীমিত হলেও মানসম্মত শিক্ষাদান সম্ভব, যদি থাকে নিষ্ঠা, পরিকল্পনা ও আন্তরিকতা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ২ নং চরপার্বতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা কাজী হানিফ আনসারী। তিনি বলেন, পাঠদানের অনুমতি পাওয়া আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। এই অর্জন পুরো এলাকার মানুষের। তিনি মাদরাসাকে অচিরেই এমপিওভুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং ভবিষ্যতে একটি আধুনিক পাকা ভবন নির্মাণে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
আরও উপস্থিত ছিলেন ৭ নং ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুল্লাহ আল মামুন, বিশিষ্ট সমাজসেবক মোঃ মাহবুবুল হক, মোঃ নুরুজ্জামান, মৌলভীবাজার ওবায়দিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার প্রধান মাওলানা আব্দুল্লাহসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘ ২৩ বছরের এ অর্জন শুধু একটি অনুমতি নয়,এটি এক প্রজন্মের আত্মত্যাগ, ধৈর্য ও স্বপ্নের ফসল। তাঁরা প্রতিষ্ঠাতা হাজ্বী আব্দুল মন্নান সাহেবের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
মাদরাসার কার্যকরী কমিটির সভাপতি প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম মানিক বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের সব সম্ভাবনা রয়েছে। এই অনুমতি আমাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে। আমরা শিক্ষার মানোন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে অচিরেই প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করবো ইনশাআল্লাহ।
এলাকাবাসীর মতে, এই অনুমোদন চরপার্বতী ইউনিয়নের শিক্ষা অগ্রযাত্রায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এতদিন যেসব শিক্ষার্থী অন্য প্রতিষ্ঠানে দাখিল রেজিস্ট্রেশন করতো, এখন তারা নিজ এলাকার এই মাদরাসা থেকেই দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। ফলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমবে এবং অভিভাবকদের আর্থিক ও মানসিক চাপও হ্রাস পাবে।
গ্রামীণ জনপদে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি শুধু প্রশাসনিক শুধু সাফল্য নয়,এটি সামাজিক জাগরণের সূচনা। আল ফালাহ ফরায়েজিয়া দাখিল মাদরাসার এই অর্জন প্রমাণ করে, স্বপ্ন যদি সৎ হয় এবং প্রচেষ্টা যদি অবিরাম থাকে, তবে সাফল্য একদিন ধরা দেয়।
২৩ বছরের দীর্ঘ পথচলার পর আজ মাদরাসাটি এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। কৃতজ্ঞতা, দোয়া ও দৃঢ় প্রত্যয়ের মাধ্যমে তারা সামনে এগিয়ে যেতে চায়। এলাকাবাসীর আশা,এই প্রতিষ্ঠান একদিন নোয়াখালী জেলায় শিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে হাফেজ সাইফুল ইসলাম দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন। দেশ, জাতি ও প্রতিষ্ঠানের সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। মোনাজাত শেষে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অতিথিদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
এই অর্জন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়,এটি পুরো চরপার্বতী ইউনিয়নের গর্ব, নোয়াখালীর অহংকার এবং গ্রামীণ শিক্ষা উন্নয়নের এক অনুপ্রেরণামূলক ইতিহাস।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment