চরহাজারীর সাহিত্যিক প্রতিভা ও প্রেরণার নাম শাহজাহান সিরাজী:
নবজ্যোতি অনলাইন ফিচার ডেস্ক:
মানুষের জীবনের ইতিহাস শুধু জন্ম, শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। কখনও কখনও সেই ইতিহাস হয়ে ওঠে সাহিত্য ও সংস্কৃতির অমর রচনা।
চরহাজারীর সাহিত্যপথের এক উজ্জ্বল নাম শাহজাহান সিরাজী। জীবনের ছোট ছোট গল্প, স্মৃতি এবং সমাজকল্যাণের নিখুঁত চেতনায় তিনি হয়ে উঠেছেন স্থানীয় মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণার প্রতীক।
শাহজাহান সিরাজী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি, গ্রাম চরহাজারী, ওয়ার্ড ৫, ডাকঘর হাজারীহাটে। পিতা মরহুম হাজ্বি মমিন উল্লাহ, এবং মাতার নাম ওজিফা খাতুন।
৪ ভাই ও ৫ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই শাহজাহান সিরাজীর মন ছন্দ, শব্দ এবং গল্পের প্রতি আকৃষ্ট। প্রাকৃতিক দৃশ্য, গ্রামীণ জীবন এবং পরিবারকে ঘিরে থাকা কাহিনিই তার প্রথম কল্পনার উৎস।
তার শিক্ষাজীবন শুরু আবু মাঝির হাট হাই স্কুলে, যেখানে তিনি ১৯৮৯ সালে এসএসসি পাশ করেন। শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ ও অধ্যবসায় তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
এরপর তিনি ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে তিনি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ, দাগনভূইয়া থেকে বিএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবনের এই ধারাবাহিকতা ছিল তার সাহিত্যিক বিকাশের প্রাথমিক ভিত্তি। শাহজাহান সিরাজীর লেখালেখির যাত্রা শুরু হয় ছাত্রজীবন থেকেই। তিনি মনে করতেন, মানুষের জীবনের গল্প, অনুভূতি ও আত্মার খুঁজকে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই প্রকৃত সাহিত্য।
প্রথম স্মরণিকা ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় “সচিএ নোয়াখালী”, যা চরহাজারী অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনের প্রাসঙ্গিক ছবি ফুটিয়ে তোলে।
দ্বিতীয় স্মরণিকা ২০১২ সালে আসে “জাগ্রত চরহাজারী”, যেখানে গ্রামের ইতিহাস, শিক্ষাজীবন এবং সমাজের নানা দিক চিত্রিত হয়েছে।
তৃতীয় স্মরণিকা ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় “ডিজিটাল চরহাজারী”, যা আধুনিক সময়ে গ্রামের ডিজিটাল রূপান্তর এবং তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে লেখা।
প্রতিটি স্মরণিকা কেবল লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন নয়, বরং এটি চরহাজারীর মানুষের জীবনচিত্র, চ্যালেঞ্জ ও সংস্কৃতিকে একটি সাহিত্যিক আলোকে তুলে ধরে।
শাহজাহান সিরাজী একজন পিতা হিসেবে চার সন্তানের প্রতি অত্যন্ত দায়িত্বশীল। তার তিন ছেলে এবং এক মেয়ে তাকে দায়িত্ব ও ভালবাসার এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করিয়েছে। পরিবার ও লেখালেখি এই দুই দিকই তার জীবনের মূল ভিত্তি।
শাহজাহান সিরাজীর জীবন শুধু সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি স্থানীয় সমাজকল্যাণের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তিনি চরহাজারী সমাজ কল্যাণ পরিষদের সেক্রেটারি ছিলেন,এবং এক্স-স্টুডেন্ট ফোরামের উপদেষ্টা (আবু মাঝির হাট হাই স্কুল) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
তার নেতৃত্বে এই সংগঠনগুলো গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থা, যুবশিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। শাহজাহান সিরাজী “আবু মাঝির হাট একাডেমী” প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
শিক্ষার মান বৃদ্ধি, বই পড়ার আগ্রহ এবং লেখালেখির প্রতি অনুপ্রেরণা এসবই তার একনিষ্ঠ প্রচেষ্টার ফল।
শাহজাহান সিরাজী লেখা লিখা ও বই পড়াকে তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেন। তার লেখা কেবল শব্দের খেলা নয়,এটি মানুষের অনুভূতি, সমাজের সংকট, গ্রামীণ জীবনের সুখ দুঃখ এবং মানসিকতার প্রতিফলন।
ছোটবেলা থেকে শুরু হওয়া তার সাহিত্যচর্চা আজ প্রমাণ করেছে যে, কোনো জীবনই অনন্য নয়, যদি তা নিজের অভিজ্ঞতা ও সমাজের জন্য দিকনির্দেশক না হয়।
সাধারণ মানুষের জীবন এবং তাদের সংগ্রাম শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ
গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য শাহজাহান সিরাজীর লেখার শৈলী সরল, জীবন্ত এবং হৃদয়স্পর্শী। তিনি বিশ্বাস করেন, সাহিত্য মানুষের আত্মা ও চিন্তাকে মুক্ত করে, এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
শাহজাহান সিরাজীর প্রতিভা শুধু সাহিত্য ও লেখালিখিতেই সীমাবদ্ধ নয়। তার সমাজকল্যাণমূলক কাজ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে উদ্যোগও প্রশংসনীয়। স্থানীয় সম্প্রদায় এবং শিক্ষাব্যবস্থা তার প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি স্থানীয় সংস্কৃতি ও শিক্ষাকে একত্রিত করার মাধ্যমে চরহাজারীর জন্য একটি শিক্ষণীয় আদর্শ স্থাপন করেছেন।
শাহজাহান সিরাজীর জীবন ও সাহিত্য আমাদের শেখায়,যে কোনো ছোট গ্রামীণ মানুষও তার প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং ভালোবাসার মাধ্যমে সমাজে অমর প্রভাব ফেলতে পারে। ৪ ভাই ও ৫ বোনের ছোট সন্তান থেকে শুরু করে একজন সমাজসেবী, শিক্ষক, লেখক এবং প্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠা পর্যন্ত তার জীবন এক নিখুঁত উদাহরণ।
আজকের চরহাজারীর যুবকরা যদি তার লেখা পড়ে, সমাজকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়, তবে শাহজাহান সিরাজীর প্রেরণা নতুন প্রজন্মকে সমাজের সেবা ও শিক্ষার পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তার লেখা, চিন্তা এবং সমাজসেবা একত্রে একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থায়ী হবে।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment