'মুছাপুর ক্লোজার পুনর্নির্মান উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন'
২৫ লক্ষ মানুষের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতির সুরক্ষায় টেকসই সমাধানই এখন একমাত্র পথ:
নব জ্যোতি অনলাইন ডেস্ক:
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ হিসেবে এ দেশের ভৌগোলিক গঠন নদী, মোহনা ও জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল। নদী যেমন কৃষি ও অর্থনীতির প্রাণ, তেমনি নদীভাঙন ও লবণাক্ততা উপকূলীয় জনপদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের কারণ।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী বহু বছর ধরেই মেঘনা ও ছোট ফেনী নদীর ভাঙন এবং জোয়ারের লবণাক্ততার সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে আছে। এই বাস্তবতায় নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর ক্লোজার ছিল লাখো মানুষের স্বপ্ন ও নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে কাঠামোগত ধস সেই নিরাপত্তা ভেঙে দেয়, সৃষ্টি করে নতুন সংকট।
ছোট ফেনী নদীর ভাঙন রোধে ১৯৬৫-৬৭-এর দশকে কাজিরহাট এলাকায় একটি রেগুলেটর নির্মিত হলেও তা ২০০২ সালে নদীগর্ভে বিলীন হয়। পরবর্তীতে ২০০৪–০৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মুছাপুরে ২৩ ভেন্টের রেগুলেটর ও প্রায় ১.০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ক্লোজার নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়। ২০১৫–১৬ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল জোয়ারের লবণাক্ত পানি নিয়ন্ত্রণ,মিঠা পানি সংরক্ষণ,বর্ষায় দ্রুত পানি নিষ্কাশন
উপকূলীয় কৃষি ও জনপদ সুরক্ষা, ক্লোজার চালু হওয়ার পর নোয়াখালী, ফেনী ও কুমিল্লার মোট ১৪টি উপজেলার প্রায় ১.৩০ লাখ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসে। কৃষি উৎপাদন ও শস্য নিবিড়তা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পায়।
বোরো ধান ছাড়াও গম, সরিষা, বাদাম ও তরমুজ চাষে ব্যাপক উন্নতি ঘটে। মুছাপুর ক্লোজার শুধু কৃষি নয়, স্থানীয় অর্থনীতিকেও গতিশীল করে তোলে। মাছের হ্যাচারি, গবাদিপশুর খামার, পোল্ট্রি শিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা বিকশিত হয়। বহু পরিবার স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করে।
একই সঙ্গে এটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পায়। বিস্তীর্ণ বালুচর ও নদীমোহনার মনোরম দৃশ্যের কারণে স্থানীয়ভাবে একে “মিনি কক্সবাজার” বলা হয়। ছুটির দিনে হাজারো দর্শনার্থীর উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল।
২৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখে অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা প্রবল পানির চাপে ক্লোজারের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, ডিজাইন ক্ষমতার চেয়ে বেশি পানি প্রবাহ এবং দীর্ঘ সময়ের চাপ কাঠামো দুর্বল করে দেয়। অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ও অবৈধ বালু উত্তোলন ভিত্তি ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করেছে।
ধসের পর কোম্পানীগঞ্জ ও সোনাগাজীর বিভিন্ন ইউনিয়নে ব্যাপক নদীভাঙন শুরু হয়। শত শত ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সড়ক অবকাঠামো। কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ায় বোরো চাষ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কৃষি সংশ্লিষ্ট সূত্রে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেচ সুবিধা বন্ধ থাকলে রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত পুনর্নির্মাণ না হলে ভাঙনের ঝুঁকি বিস্তৃত হয়ে কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চল জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ হওয়ায় টেকসই বাঁধ ও জলনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন, ১. আধুনিক হাইড্রোলজিক্যাল ও জিওটেকনিক্যাল সমীক্ষা। ২. গভীর ভিত্তি ও শক্তিশালী সুরক্ষা কাঠামো। ৩. অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর নজরদারি। ৪. নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মনিটরিং ব্যবস্থা।
মুছাপুর ক্লোজার কেবল একটি অবকাঠামো নয়, এটি উপকূলীয় জনজীবনের নিরাপত্তা বলয়। কৃষি, অর্থনীতি, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। তাই এর পুনর্নির্মাণে বিলম্ব মানেই বহুগুণ ক্ষতির ঝুঁকি।
সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনায় মুছাপুর ক্লোজার পুনর্নির্মাণ করা হোক। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হোক এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নীতি গ্রহণ করা হোক।
উপকূল রক্ষা মানেই মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সুরক্ষা। মুছাপুর ক্লোজার পুনর্নির্মাণ এখন শুধু একটি প্রকল্প নয় এটি ২৫ লক্ষ মানুষের ন্যায্য দাবি। সময়োচিত, টেকসই ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগই পারে উপকূলবাসীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং অঞ্চলের উন্নয়নের ধারাকে পুনরুদ্ধার করতে।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment