ঢাকা    ,
সংবাদ শিরোনাম : 'পশ্চিমা শক্তির কাছে খোমেনীর ইরান মাথা নত করেনি করবে না' দাগনভূঞায় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ উদ্যোগে শীতার্ত পরিবারে মাঝে কম্বল বিতরণ: জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক ফিলোসফি ও সংঘটনের অভ্যন্তরীণ আদর্শিক অবকাঠামো পরিবর্তন : 'সাদা অ্যাপ্রনের নীরব আলো' 'আলোর পথে চিকিৎসক ফরিদুল ইসলামের জীবনযাত্রা' 'শতবর্ষী তাকিয়া জামে মসজিদের নিচ তলায় মার্কেট নির্মানের চেষ্টা' দাগনভূঞায় সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১ আহত ৬: জাতীয় সড়ক যোদ্ধা পুরস্কারে ভূষিত দাগনভূঞার সাংবাদিক সোহেল: নির্বাচন কমিশনের যাচাইয়ে উত্তীর্ণ জামায়াত প্রার্থী নোয়াখালী-৫ এ উৎসবমুখর পরিবেশ : গণতন্ত্র রক্ষায় বেগম খালেদা জিয়ার অবদান অবিস্মরনীয়' কোম্পানীগঞ্জে মোঃ ফখরুল ইসলাম :

মানব সৃষ্টির রহস্য, তাসাউফ ও লতিফার আলোকে আল্লাহর সন্ধান: লেখকঃ মোঃ আল এমরান ।।

মানব সৃষ্টির রহস্য, তাসাউফ ও লতিফার আলোকে আল্লাহর সন্ধান:  লেখকঃ মোঃ আল এমরান  ।।

।। মানব সৃষ্টির অদৃশ্য রহস্য।।

মানুষ কেবল মাটি, পানি, আগুন ও বাতাসের তৈরি একটি দেহ নয়, বরং আত্মা, রূহ, নফস, কলব ও লতিফার সমন্বয়ে গঠিত এক বিস্ময়কর সৃষ্টি।

কুরআনে আল্লাহ বলেন,

আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির সারাংশ থেকে।

(সূরা মু’মিনূন ২৩:১২)

আরও বলেন, তারপর তাতে আমি নিজ রূহ ফুঁকে দিয়েছি।(সূরা সাজদাহ ৩২:৯)

এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, মানব সৃষ্টিতে আছে দুটি জগতের সংযোগ:

আলমে খালক (সৃষ্টি জগত) ও আলমে আমর (আদেশের জগত)।

দেহ আলমে খালকের প্রতিফলন, আর আত্মা আলমে আমর থেকে আগত আল্লাহর নির্দেশের প্রতিফলন।

মানব সৃষ্টির উপাদান : চার মৌলিক উপাদান

ইসলামী তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ সৃষ্টি হয়েছে চারটি উপাদান থেকে,

১️. মাটি (তুরাব) – বিনয়, ধৈর্য ও স্থিতির প্রতীক।

২️. পানি (মা’আ) – পবিত্রতা, নম্রতা ও জীবনধারার প্রতীক।

৩️. বাতাস (হাওয়া) – চিন্তা, শব্দ ও চলাচলের প্রতীক।

৪️.আগুন (নার) – শক্তি, উচ্ছ্বাস ও ক্রোধের প্রতীক।

রাসূলুল্লাহ বলেন, আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন মাটি থেকে।

(তিরমিযি, হাদীস ২৯৫৫)

এই চার উপাদান মানুষের চরিত্রেও প্রতিফলিত হয়,

মাটির কারণে বিনয়ী, পানির কারণে কোমল, বাতাসের কারণে চিন্তাশীল, আর আগুনের কারণে সাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয় মানুষ।

দেহ ও আত্মার সমন্বয় : আলমে আমর ও আলমে খালক

মানুষের দেহ আল্লাহর সৃষ্টিকর্ম, আর আত্মা আল্লাহর আদেশের প্রকাশ।

কুরআনে বলা হয়েছে, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি, তারপর তাতে নিজ রূহ ফুঁকে দিয়েছি।

(সূরা হিজর ১৫:২৯)

অর্থাৎ দেহ ও রূহের মিলনে মানুষ পরিপূর্ণ হয়।

দেহের কাজ ইবাদত ও কর্ম, আর রূহের কাজ আল্লাহর দিকে আকর্ষণ।

এই দুইয়ের সাদৃশ্যই মানুষকে “আশরাফুল মাখলুকাত” বা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি করেছে।

লতিফার তত্ত্ব : দেহের ভেতরের নূর

তাসাউফে মানুষকে বলা হয় “লতিফাতুল ইনসান” সূক্ষ্ম আত্মিক শক্তিগুলোর সমষ্টি।

মানব দেহে দশটি লতিফা বা আধ্যাত্মিক কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর নূর মানুষের অন্তরে প্রবাহিত হয়।

আলমে আমরের পাঁচ লতিফা (আত্মিক কেন্দ্র):

১️. কলব (হৃদয়) — ইমান ও ভালোবাসার কেন্দ্র।

২️. রূহ (আত্মা) — জীবন ও নূরের কেন্দ্র।

৩️. সির (গোপন চেতনা) — আল্লাহর রহস্যের কেন্দ্র।

৪️. খফি (অন্তর্গত রহস্য) — আত্মার গভীরতম স্তর।

৫️. আখফা (অত্যন্ত গোপন) — আল্লাহর সান্নিধ্যের দরজা।

আলমে খালকের পাঁচ লতিফা (দেহিক কেন্দ্র):

৬.নফস (প্রবৃত্তি) — কামনা ও অহঙ্কারের উৎস।

৭️. পানি (আব) — পবিত্রতার প্রতীক।

৮️. আগুন (আতশ) — শক্তি ও আবেগের প্রতীক।

৯️. মাটি (খাক) — স্থিতি ও বিনয়ের প্রতীক।

১০.বাতাস (বাদ) — জীবনপ্রবাহের প্রতীক।

লতিফা ও আত্মশুদ্ধির পথ

এই লতিফাগুলো প্রত্যেকটি মানুষের অন্তরের একেকটি পর্দা।

তাসাউফের সাধনায় বা জিকির, মুরাকাবা ও মুজাহাদার মাধ্যমে লতিফাগুলো পরিশুদ্ধ হয়।

যখন কলব পরিশুদ্ধ হয়, তখন রূহ জাগ্রত হয়;

রূহ জাগ্রত হলে সির, খফি ও আখফা আলোকিত হয়।

শেষে মানুষ মারফতের মাকামে পৌঁছে আল্লাহর নূরে বিলীন হয়।

কুরআন বলেন,সেদিন ধন-সম্পদ বা সন্তান কোনো কাজে আসবে না, কেবল সে ব্যতীত যে পরিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে আল্লাহর সামনে আসবে।

(সূরা আশ-শু‘আরা ২৬:৮৮–৮৯)

পীর-মুর্শিদের ভূমিকা : আত্মার দিশারী

যেমন অন্ধ পথিক আলোর দিশা পেতে গাইডের প্রয়োজন হয়, তেমনি আত্মিক সাধনায় প্রয়োজন হয় পীর বা মুর্শিদের দিকনির্দেশনা।

রাসূলুল্লাহ বলেছেন,

আল্লাহর বন্ধুদের সঙ্গে বস, তারা এমন মানুষ যাদের চেহারা দেখলে আল্লাহর কথা মনে পড়ে।

(তিরমিযি, হাদীস ২৩৭৮)

পীরের কাজ হলো মুরিদের নফসকে সংযত করা, কলবকে পরিশুদ্ধ করা এবং তাকে জিকিরে স্থিতিশীল করা।

তরিকার সাধনা পীরের তত্ত্বাবধানে করলে লতিফাগুলোর জাগরণ ঘটে, হৃদয় আল্লাহর নূরে আলোকিত হয়।

শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারফতের ক্রমধারা

সুফিবাদ শেখায়, ইসলামী সাধনার চারটি স্তর আছে,

১️. শরিয়ত — আল্লাহর বিধান অনুসরণ (নামাজ, রোজা, হালাল-হারাম জানা)।

২️. তরিকত — শরিয়তের বাস্তব চর্চা, আত্মার নিয়ন্ত্রণ ও জিকিরে স্থিরতা।

৩️. হাকিকত — সত্যের উপলব্ধি, আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করা।

৪️. মারফত — আল্লাহর সাথে প্রেমের মিলন, তাঁর নূরে বিলীন হওয়া।

তাসাউফ বলে, শরিয়ত হলো নৌকা, তরিকত হলো সমুদ্র, হাকিকত হলো মুক্তা, আর মারফত হলো সেই মুক্তার রূপ।

পীরের মাধ্যমে লতিফার জাগরণ,

পীর-মুর্শিদ হলেন সেই আত্মিক শিক্ষক, যিনি আল্লাহর ইলমে রত হয়ে অন্যের কলব জাগ্রত করতে পারেন।

তিনি মুরিদকে শেখান জিকিরে কলবী (হৃদয়ের জিকির), জিকিরে রুহী (আত্মার জিকির), এবং জিকিরে সীরী (গোপন জিকির)।

এগুলো এক এক করে লতিফাগুলিকে জাগ্রত করে।সুফিবাদে বলা হয়, পীর ছাড়া তরিকা অন্ধের মতো। আর পীরের হাতে আত্মা দিলে তা আল্লাহর দরবারে আলোকিত হয়।

অতএব, আত্মশুদ্ধি, লতিফার জাগরণ ও মারফতের জ্ঞান অর্জনের জন্য পীরের সান্নিধ্য অপরিহার্য।

ইবাদতের উদ্দেশ্য : আল্লাহর সাথে সংযোগ

কুরআনে বলা হয়েছে, আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য।”

(সূরা যারিয়াত ৫১:৫৬)

ইবাদতের উদ্দেশ্য কেবল শরীরচর্চা নয়; এটি আত্মার আল্লাহমুখী যাত্রা।

যখন দেহ, নফস ও কলব একত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করে — তখনই ইবাদত পূর্ণতা পায়।

তাসাউফের মূল দর্শন : নিজেকে জানো,

আল্লাহকে চেনো তাসাউফের সার কথা হলো,যে নিজের নফসকে চিনেছে, সে তার রবকে চিনেছে।

নিজেকে চেনা মানে নিজের দুর্বলতা, প্রবৃত্তি ও নফসের সীমা জানা।

যখন মানুষ নিজের অন্তরকে আল্লাহর নূরে পরিশুদ্ধ করে, তখন সে উপলব্ধি করে,

আমার জীবন, মৃত্যু, দেহ ও আত্মা সবকিছুই আল্লাহর জন্য। (সূরা আন‘আম ৬:১৬২)

পরিশেষে কলবের পরিশুদ্ধতাই আল্লাহর সাক্ষাৎ।

মানুষের দেহ হলো আলমে খালক, আত্মা আলমে আমর থেকে আগত।

চার উপাদানের দেহ ও লতিফার আত্মা একত্রে আল্লাহর রহস্য ধারণ করে।

পীর-মুর্শিদের তত্ত্বাবধানে, শরিয়তের আনুগত্য ও তরিকতের সাধনায় যখন কলব আলোকিত হয়, তখন মানুষ হাকিকত ও মারফতের পথে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করে।

তাসাউফের লক্ষ্য একটাই,দেহ, কলব ও রূহকে আল্লাহর ইচ্ছার সাথে এক করে দেওয়া।

হে আল্লাহ! আমাদের হৃদয়কে তোমার নূরে পরিশুদ্ধ করো, তোমার হাকিকত চিনার তাওফিক দাও, এবং আমাদেরকে তোমার ওলীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করো। আমিন।

মানব দেহ চার উপাদানে গঠিত, আত্মা আলমে আমর থেকে আগত। লতিফাগুলোর সাধনা ও পীরের দিকনির্দেশনায় মানুষ নিজের কলব পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর নূরে মিলিত হয়।

এই-ই তাসাউফের দর্শন শরিয়ত থেকে তরিকতের পথে, হাকিকতের উপলব্ধিতে, মারফতের মিলনে

আল্লাহর সাক্ষাৎ।

Comments (0)

Be the first to comment on this article.


Leave a comment

Your comment will be reviewed before publication.