ঢাকা    ,
সংবাদ শিরোনাম : ভাঙনের ছোট ফেনী নদী, ভাঙা জীবনের আর্তনাদ, কোম্পানীগঞ্জের দুই ওয়ার্ডের দীর্ঘ বেদনার কাহিনী: তরমুজ ক্ষতি শেষে গরু চুরি-চরপার্বতীতে উদ্যোক্তা বাবুর হতাশা,নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন: বেগমগঞ্জে তিন ইটভাটাকে অর্থদণ্ড: বেগমগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন: কোম্পানীগঞ্জে বৈশাখের বর্ণিল আবাহন ঐতিহ্য, উৎসব আর মানুষের মিলনমেলা শুভ নববর্ষ ।। মোঃ হাসান বিন ইউসুফ ।। আমি বিদ্রোহ! মোঃ হাসান বিন ইউসুফ কোম্পানীগঞ্জে তীব্র গ্যাস সংকট মধ্যরাতে রান্না জনজীবন বিপর্যস্ত: ছোট ফেনী নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে চরপার্বতীর ৯ নং ওয়ার্ড,আতঙ্কে নদীতীরের জনগোষ্ঠী: নোয়াখালীর কবিরহাটে নিখোঁজের দুই দিন পর ইটভাটা শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার:

ভাঙনের ছোট ফেনী নদী, ভাঙা জীবনের আর্তনাদ, কোম্পানীগঞ্জের দুই ওয়ার্ডের দীর্ঘ বেদনার কাহিনী:

ভাঙনের ছোট ফেনী নদী, ভাঙা জীবনের আর্তনাদ, কোম্পানীগঞ্জের দুই ওয়ার্ডের দীর্ঘ বেদনার কাহিনী:

ভাঙনের ছোট ফেনী নদী, ভাঙা জীবনের আর্তনাদ,

কোম্পানীগঞ্জের দুই ওয়ার্ডের দীর্ঘ বেদনার কাহিনী:

নদীর চিরায়ত রূপের আড়ালে প্রান্তিক মানুষের কান্না অবহেলা,অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আর টিকে থাকার লড়াই:

নব জ্যোতি রিপোর্ট ডেস্ক:

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরপার্বতী ও চরহাজারী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড,এ যেন এক দীর্ঘশ্বাসের ভূখণ্ড।

এখানে নদী শুধু নদী নয়,একদিকে জীবনদাত্রী, অন্যদিকে ধ্বংসের দূত। এই জনপদের মানুষের কষ্ট আজকের নয়,ছয় যুগেরও বেশি সময় ধরে নদীর সঙ্গে লড়াই করেই তাদের প্রতিটি দিন শুরু হয়, প্রতিটি রাত শেষ হয়।

বিগত ২০০০ সালের আগেই এ অঞ্চলে প্রবল ভাঙনের কালো ছায়া নেমে আসে।২০০২ সালে কাজীরহাট স্লুইসগেট ভেঙে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দুর্ভোগের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। নদীর দুই পাড়ের সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন তখন থেকেই ক্রমশ অনিশ্চয়তার দিকে গড়াতে থাকে।

নদীর ভাঙন শুধু মাটিকেই গ্রাস করেনি, কেড়ে নিয়েছে মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।

নদীর নিজস্ব এক ভাষা আছে,কখনো শান্ত, কখনো প্রলয়ংকর। বর্ষাকালে তার রূপ হয়ে ওঠে ভয়ংকর।

ফেনী নদীর উত্তাল ঢেউ যখন তীর ছুঁয়ে যায়, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজের শক্তির ঘোষণা দিচ্ছে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে গভীর হাহাকার। প্রতিটি ভাঙনে একটি পরিবার গৃহহীন হয়, প্রতিটি ঢেউ যেন একটি জীবনের ইতিহাস মুছে দেয়।

রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গেও এই জনপদের ভাগ্য খুব একটা বদলায়নি। একসময় তৎকালীন বিএনপি সরকারের অবহেলার অভিযোগ উঠেছিল, যখন চরপার্বতী-উত্তর চরসাহাভিকারী স্লুইসগেট পুনর্নির্মাণ হয়নি।

পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের হস্তক্ষেপে মুছাপুর ক্লোজার নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিছু কাজ সম্পন্ন হলেও,ক্লোজার নির্মাণের বাকী কাজ করার সুযোগ হয়নি।

পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলেও প্রত্যাশিত উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়নি। বরং মুছাপুর ক্লোজার নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। নদীর স্রোত আর সময়ের আঘাতে সেই কাঠামোও আজ বিলীন।

২০২৪ সালের ২৬ আগস্টের ঘটনা এই জনপদের জন্য এক চরম ট্র্যাজেডি হয়ে আসে। উজানের পানির তীব্র স্রোতে ক্লোজার ভেঙে গিয়ে মুহূর্তেই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, গবাদিপশু

সবকিছু হারিয়ে মানুষ হয়ে পড়ে নিঃস্ব।

চোখের সামনে জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ভেসে যেতে দেখা ছিল এক অসহনীয় যন্ত্রণা।এই অঞ্চলের মানুষ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনে বরাবরই সচেতন। চরপার্বতীর ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষ বিপুল ভোটে কাজী মোহাম্মদ হানিফকে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করেন।

তিনি চেষ্টা চালিয়েও নদীভাঙন রোধে পুরোপুরি সফল হতে পারেননি,এ যেন এক ব্যক্তির সীমাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি।

পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনে এখানকার মানুষ বিএনপি প্রার্থী ফখরুল ইসলামকে সমর্থন দেন। কিন্তু নির্বাচনের পরও প্রত্যাশিত পরিবর্তন না আসায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।

তাদের প্রশ্ন ভোটের সময় যারা প্রতিশ্রুতি দেন, ভাঙনের সময় তারা কি পাশে থাকেন।

অন্যদিকে, চরহাজারী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে কিছু উন্নয়নমূলক কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। তবে একই উপজেলার অন্য ওয়ার্ডে সেই উন্নয়নের ছোঁয়া না পৌঁছানো বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে।

নদী এখানে শুধু প্রাকৃতিক উপাদান নয়,এটি এক জীবন্ত চরিত্র, যা মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে। কখনো উর্বরতা দেয়, আবার কখনো সবকিছু কেড়ে নেয়। এই দ্বৈত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।

প্রান্তিক মানুষের জীবন এখানে অত্যন্ত কঠিন। অনেকেই একাধিকবার ঘর হারিয়েছেন, নতুন করে বসতি গড়েছেন, আবার ভেঙে যেতে দেখেছেন।

শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হয়, কৃষকের ফসল নষ্ট হয়, জেলেদের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

নারীদের দুর্ভোগ আরও গভীর,নিরাপত্তাহীনতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

গণমাধ্যমে একাধিকবার এই অঞ্চলের সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্ট হয়েছে, ছবি প্রকাশ হয়েছে, প্রতিশ্রুতি এসেছে,কিন্তু বাস্তবতার তেমন পরিবর্তন হয়নি। ধীরগতির প্রকল্প, পরিকল্পনার অভাব এবং সমন্বয়হীনতা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই জনপদের মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়। তারা চায় একটি স্থায়ী বাঁধ, কার্যকর স্লুইসগেট, টেকসই সেতু এবং নিরাপদ বসতি। ভাঙনের শিকার মানুষ চান পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তা।

তারা এমন একটি ভবিষ্যৎ চায়, যেখানে তাদের সন্তানরা ভয় নয়, স্বপ্ন নিয়ে বড় হবে। নদীর চিরন্তন রূপ যেমন অনিবার্য, তেমনি মানুষের জীবনও থেমে থাকে না। ভাঙনের মধ্য দিয়েও তারা নতুন করে স্বপ্ন দেখে, আবার ঘর বাঁধে, আবার বাঁচার চেষ্টা করে।

কিন্তু এই সংগ্রামকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রের আন্তরিকতা, পরিকল্পিত উদ্যোগ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন। কোম্পানীগঞ্জের এই দুই ওয়ার্ড আজ যেন এক প্রতীক,অবহেলা, বঞ্চনা এবং অদম্য লড়াইয়ের।

তাদের আর্তনাদ শুধু একটি অঞ্চলের নয়,এটি পুরো দেশের প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর।সেই কণ্ঠস্বর শোনা, বোঝা এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

Comments (0)

Be the first to comment on this article.


Leave a comment

Your comment will be reviewed before publication.