“ভোগান্তির আরেক নাম মৌলভীবাজার টু কাজীরহাট স্লুইসগেট দুই যুগের কান্না :
নবজ্যোতি অনলাইন ফিচার ডেস্ক:
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের পূর্বাঞ্চল চরপার্বতীর মৌলভীবাজার হতে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা
পশ্চিম উওর চরসাহাভিকারী, মৌলভীবাজার টু কাজীরহাট সুইচ গেইট দুই উপজেলার সীমান্তে প্রবাহিত এক নদীর দুই পাড়, দু’পাশে হাজার
মানুষের বসতি, বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রতিদিনের চলাচল,সবকিছু এক সময় নির্ভর করত কাজীরহাট স্লুইসগেটের ওপর।
১৯৬২ সালে নির্মিত এই স্লুইসগেট ছিল এই জনপদের প্রাণস্পন্দন। কিন্তু ২০০২ সালের প্রবল ঢল ও
জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে যাওয়ার পর থেকে দুই জমিন যেন
বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে।সেই ভাঙা স্লুইসগেট আর কখনো মেরামত হয়নি।সময় কেটে গেছে চব্বিশ বছর।সরকারি প্রতিশ্রুতি এসেছে বহুবার কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি একটিও।
আজও মৌলভীবাজার টু কাজীরহাট উত্তর চরসাহাভিকারীর মানুষ প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হন।মাতৃগর্ভের শিশু থেকে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বৃদ্ধ পর্যন্ত,সবার কাছে ভাঙা স্লুইসগেটের মানেই ভয়, আতঙ্ক ও অমানবিক দুর্ভোগ।
২০০২ সালের ভরা বর্ষা। পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ভারতীয় সীমান্ত থেকে নেমে আসা প্রবল স্রোতে ফেনী জেলার বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়।
সেই প্লাবনে কাজীরহাট স্লুইসগেটের ওপর আঘাত হানে নদীর উত্তাল জোয়ার,একাকার হয়ে ভেঙে পড়ে পুরো স্থাপনাটি।
স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না।
নোনা পানির প্রবেশ, মাছ ধরার উদ্দেশ্যে গেট বন্ধ করে রাখা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব সব মিলিয়ে স্লুইসগেট টির ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছিল অনেক আগেই।
বন্যার পানি ছিল শুধু শেষ আঘাত।সেদিনের সেই ভাঙন আজও অক্ষত রয়ে গেছে।সময় বদলায় সরকার বদলায়, উন্নয়ন বদলায়,কিন্তু এই স্লুইসগেট যেন এক অভিশাপের মতো একই জায়গায় পড়ে আছে।
মানুষের দৈনন্দিন জীবন যেন প্রতিদিনের যুদ্ধ যাতায়াত, ভয় আর ঝুঁকির নৌকা সুইচগেইটের ঘাটে গিয়ে দেখা যায় সকাল থেকেই মানুষের লাইন।
নৌকার গায়ে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানিতে কাদা
লেগে যায়, আবার জুতা খুলে কাদা মাটি উপর নৌকায় উঠতে হয়, নরম মাটির কারনে নৌকা ও ঘাট পিচ্ছিল হয়ে যায়।
দূর্ভোগের শেষ, নাই, হোন্ডা, সাইকেল পার করতে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করে, ঘাট পারা পারের মাঝি পক্ষ।
একজন বয়স্ক মানুষ নৌকায় উঠতে গিয়ে বারবার পা পিছলে যাচ্ছেন।হাত ধরে তুলছে অন্য কেউ।
এক বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বলেন,বাবা, এ বয়সে আর কতবার পড়ব।সেতুটা করলে কি আমাদের পড়তে হইত।
ছোট ছোট শিশুরা ভয় ভরা চোখে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে।স্কুলে যাওয়ার পথ তাদের কাছে প্রতিদিনের আতঙ্ক।একজন মা কোলের শিশুকে আঁকড়ে ধরে বলেন,নৌকা দুললে মনে হয় বাচ্চা হাত থেকে পড়ে যাবে।
গর্ভবতী নারী ও রোগীর দুর্ভোগ এলাকার সবচেয়ে মর্মান্তিক কষ্ট বহন করেন গর্ভবতী মা, অসুস্থ মানুষ ও জরুরি রোগী।
রাতে নদী পার হওয়া মানেই জীবনকে হাতে নিয়ে যাত্রা।স্থানীয়রা বলেন,রাতে কখনো ডাক্তার দেখাতে গেলে নৌকায় উঠাই যায় না।
এইসব ঘটনা কোনো রিপোর্টে আসে না।কোনো ডায়েরিতে লেখা থাকে না। থেকে যায় নদীর অন্ধকারের সঙ্গে একাকার হয়ে।
একসময় এই পথে প্রতিদিন যাওয়া আসা করত দুই জেলার কয়েকশ শিক্ষার্থী।আজ অনেক পরিবার সন্তানদের পড়াতে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে।
এক ছাত্র বলে,নদী দেখলেই ভয় লাগে। মাঝে মাঝে নৌকা হেলে পড়ে। স্কুলে যাই না,মা যেতে দেয় না।
এই পথে যাতায়াত বন্ধ হওয়ায় অনেকেরই স্কুল বদলাতে হয়েছে।শিক্ষার মান কমেছে, স্বপ্ন থেমে গেছে নদীর মাঝেই।
স্লুইসগেট ভেঙে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে থেমে গেছে মৌলভীবাজার টু কাজীরহাটের অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য।সবজি, ধান, মাছ, হাঁস,মুরগি কোনো পণ্যই ঠিকমতো বাজারে পৌঁছায় না।
পণ্যের দাম পড়ে যায়, কৃষক লোকসান গুনে।
এক কৃষক বলেন,ট্রলি যায় না, ভ্যান যায় না, নৌকায় নিলে ডুবার ভয়।আমাদের ফসল নষ্ট হইয়া যায় কেউ দেখার নাই।
একসময় মৌলভীবাজার–কাজীরহাট ছিল দু’জেলার ব্যবসার সংযোগ কেন্দ্র। কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা বসুরহাট, হাজারীহাট,কদমতলা,আবুমাঝির হাট,
চৌধুরী হাট, মৌলভীবাজার মানুষজন সুইস গেট পার হয়ে কাজীর হাটে যেত, পন্য বিক্রি করতো, আমদানী রপ্তানী হত, অর্থনৈতিক চাঙ্গা হতো সেই বাজারগুলো অর্ধেক খালি।
বণিক সমিতির মতে,একটি ব্রিজ হলে এখানকার ব্যবসা পাঁচগুণ বাড়ত, এখন ব্রীজ না হওয়াতে পুরো এলাকা পিছিয়ে গেছে।
মৌলভীবাজার, চরসাহাভিকারী, কাজীরহাট এই তিন অঞ্চলের মানুষকে ৫ মিনিটের পথের জন্য প্রায় ৪০-৫০ মিনিট ঘুরে যেতে হয়।অর্থনৈতিক উন্নয়ন পুরোপুরি স্থবির।
সুইচের গেটের ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ বলেন,
সরকারের প্রতিনিধির কাছে যেদিন যাই, সেদিনই বলে,হবে হবে।কিন্তু কই। আজও তো কিছুই হয় নাই।
এক নারী বলেন,আমরা ভিক্ষা চাই না। আমরা বাঁচার জন্য একটা ব্রিজ চাই।এক শিক্ষার্থী বলল,আমরা সরকারের আর নাটক উদাসীনতায় দেখতে চাইনা,
এই এক বাক্যে ফুটে ওঠে পুরো অঞ্চলের বঞ্চনার ইতিহাস।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারি বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, প্রকৌশলী সকলেই এসে বলেছেন,শীঘ্রই কাজ শুরু হবে।নকশা হয়েছে,ফাইল প্রক্রিয়াধীন,টেন্ডার হবে।
কিন্তু ফাইল আর নকশা ঠিকই ঢুকে পড়ে ধুলার আস্তরণে,ব্রিজ পুনর্নির্মাণের কাজ আর বাস্তব রূপ পায় না।দুই জেলার মানুষ তাই বলেন,প্রতিশ্রুতি পাইছি অনেক, ব্রিজ পাইনি একটাও।
মানববন্ধন হয়েছে বহুবার, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে অসংখ্য পোস্ট,প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে কতবার, মঞ্চে বক্তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ শূন্য।
জনগণের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ সামনে আনতে “মাসিক নব জ্যোতি”-র একটি অনুসন্ধানী টিম নেমেছে মাঠে। পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ আল এমরান,বিশেষ প্রতিনিধি হোসেন, কবিরহাট প্রতিনিধি ইদ্রিস হাসান
সরাসরি ঘটনাস্থলে গিয়ে মানুষের মুখের কথা শুনে, ছবি সংগ্রহ করে, বাস্তব পরিস্থিতি নথিবদ্ধ করেছেন।
মাসিক নব জ্যোতি পএিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ আল এমরান বলেন, এলাকাটি আমার জন্মস্থান, খ্রিস্টীয় ২০০২ সালে, আমি ফেনীর দ্বিভাষীক
সাপ্তাহিক পএিকা ফেনী টাইমস স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি। এ সুইচ গেইট নিয়ে একটি নিউজ করি, দু জেলার জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কে
পএিকার নিউজ পৌঁছায়। আজ ২৩ বছর হয়ে গেলো, কর্তৃপক্ষ নীরব, এটা খুবই দুঃখ জনক। মানুষের মুখে একই আর্তি আমরা বাঁচতে চাই আমাদের ব্রিজ ফিরিয়ে দিন।
ডকুমেন্টেশন চলাকালে নদীর ঘাটে এক দৃশ্য দেখা যায়,এক গর্ভবতী নারীকে স্বজনরা ধরে ধরে নৌকায় তুলছে।মাটির ঘাট পিচ্ছিল, নদী ভয়াবহ স্রোত,একটি ভুল পদক্ষেপ মানেই জীবন ঝুঁকিতে।
আরেক বৃদ্ধ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে চার পাঁচজন মিলে তাকে বাঁচান।এইসব দৃশ্য শুধু সংবাদ নয়,
এগুলো মানুষের কান্না, যন্ত্রণা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
আজ মৌলভীবাজার, চরসাহাভিকারী, কাজীরহাটের হাজারো মানুষের দাবি একটাই দ্রুত একটি নতুন ব্রিজ নির্মাণ,এটাই হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, কৃষি সব কিছু বদলে যাবে।
দুই জেলার সরাসরি যোগাযোগ পুনর্বহাল বর্তমানের বিকল্প দূরপথ মানুষকে আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্লুইসগেটের পানিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনর্বহাল এলাকার কৃষি রক্ষার জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
উপকূলীয় এলাকার জন্য জরুরি যোগাযোগ পথ
সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাসের সময় এই পথটি বাঁচার একমাত্র আশা।
সন্ধ্যার আকাশে লাল সূর্য ডুবে যাওয়ার সময় নদীর ওপরে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে।কিন্তু সেই শান্তির নিচে লুকিয়ে থাকে হাজার মানুষের অপেক্ষা একটি সেতুর অপেক্ষা।
ভাঙা স্লুইসগেটের ওপর বাতাস বইলে মনে হয় কেউ যেন কান্না করছে।নদী কি বুঝি মানুষের দুঃখ বোঝে?
প্রতিবছর বর্ষায় নদী ফুলে ওঠে,আর মানুষ নেমে যায় আতঙ্কে।চব্বিশ বছরের এই অবহেলা শুধু একটি রাস্তার অবহেলা নয়,এটা একটি অঞ্চলের স্বপ্ন ভাঙার
ইতিহাস।মানুষের একটাই কথা,আমাদের বাঁচতে দিন। আমাদের ব্রিজ দিন।এই রিপোর্ট কোনো অভিযোগ নয় এটি এক আর্তনাদ।এই লেখা কোনো রাজনৈতিক
বিবৃতি নয়, এটি দুই জেলার সীমান্তবাসীর জীবনকথা।
কাজীরহাট স্লুইসগেট পুনর্নির্মাণ হলে শুধু একটি ব্রীজই তৈরি হবে না তৈরি হবে হাজার মানুষের নিরাপত্তা, সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment