হুকুমের দাসত্ব বনাম নাগরিক নিরাপত্তা:
পুলিশ সংস্কারের মূল সংকট কোথায়?
~ নাবিল নিশাত
সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে শিশু নিখোঁজ, ক্রমবর্ধমান সামাজিক সহিংসতা এবং অপরাধের বিচিত্র রূপান্তর নাগরিক মনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনী মাঠে ফিরলেও, অপরাধ দমনে তাদের সাড়াদানের গতি এবং কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। মাঠ পর্যায়ের এই মন্থরতাকে কেবলই একক কোনো পুলিশ সদস্যের ‘পেশাগত অবহেলা’ হিসেবে দেখলে তা হবে একটি সরলীকরণ মাত্র।
সমাজতাত্ত্বিক ও কাঠামোগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সংকট মূলত একটি ভঙ্গুর ও শতাব্দী প্রাচীন আইনি কাঠামো এবং বাহিনীর গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্রমার সম্মিলিত ফল।বাংলাদেশ পুলিশ আজ যে প্রাতিষ্ঠানিক পরাধীনতার বৃত্তে বন্দি, তার শেকড় প্রোথিত রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ‘১৮৬১ সালের পুলিশ আইনে’।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর তৎকালীন ব্রিটিশ রাজ এ দেশের সাধারণ মানুষকে নাগরিক সেবা দেওয়ার জন্য এই বাহিনী গঠন করেনি; বরং তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো মূল্যে জনআন্দোলন দমন করা এবং ঔপনিবেশিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা। দুঃখজনকভাবে, স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোতেও এই আইনের কাঠামোগত পরিবর্তন করা হয়নি।
বিশেষ করে এই আইনের ৩ নম্বর ধারাটি, যা পুলিশ বাহিনীর ওপর সরকারের একচ্ছত্র প্রশাসনিক ও তদারকি নিয়ন্ত্রণ ন্যস্ত করেছে, তা প্রতিটি শাসকদলকেই পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের আইনি সুযোগ করে দিয়েছে।
ফলে একটি রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান কালক্রমে রূপান্তরিত হয়েছে সরকারের রাজনৈতিক ‘লাঠিয়াল বাহিনীতে’।এই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মনস্তত্ত্ব এবং ক্যারিয়ারের ওপর। পুলিশ একটি কঠোর শৃঙ্খলা বাহিনী, যেখানে চেইন অব কমান্ড বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করার অর্থ হলো তাৎক্ষণিক পেশাগত বিপর্যয়।
বদলি, কাঙ্ক্ষিত পোস্টিং কিংবা পদোন্নতির মতো বিষয়গুলো যখন সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক বিবেচনার ওপর নির্ভর করে, তখন একজন কর্মকর্তার পক্ষে স্বাধীনভাবে আইন প্রয়োগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা সাধারণ পুলিশ সদস্যদের সামনে চাকরি টিকিয়ে রাখা এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে বাস্তব সংগ্রাম থাকে, তা তাদের এক ধরণের ‘বাধ্যগত আনুগত্যের’ দিকে ঠেলে দেয়।
তবে কাঠামোগত এই অসহায়ত্ব কোনোভাবেই পুলিশের আইনগত ও নৈতিক সীমারেখা লঙ্ঘনের যৌক্তিক অজুহাত হতে পারে না। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবারের ‘আমলাতান্ত্রিক তত্ত্ব’ অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক হুকুম মানার একটি নির্দিষ্ট আইনি ও নৈতিক সীমানা রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের কোনোটিই "ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বেআইনি আদেশ" মেনে কোনো নাগরিকের জীবন কেড়ে নেওয়া বা গুম করার মতো অপরাধকে বৈধতা দেয় না। বাধ্য হয়ে হুকুম তামিল করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিক অধিকার হরণ করার মধ্যে যে স্পষ্ট ফারাক রয়েছে, তা আজ আইনি জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এই ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুলিশ সংস্কারের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।
সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব সরফরাজ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত 'পুলিশ সংস্কার কমিশন' দীর্ঘ পর্যালোচনার পর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ১০৮টি সুপারিশ সম্বলিত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়।
এই সংস্কারের মূল লক্ষ্যই ছিল পুলিশকে রাজনৈতিক বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন, পেশাদার ও জনমুখী বাহিনীতে রূপান্তর করা।অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গৃহিত ও প্রস্তাবিত মূল পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল:আইনি আমূল রূপান্তর: ব্রিটিশ আমলের শতাব্দী প্রাচীন ঔপনিবেশিক আইন ভেঙে ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ আইনসহ মোট ২২টি বিদ্যমান আইন সংশোধনের সুপারিশ করা হয়।
স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন: পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠনের খসড়া অধ্যাদেশ তৈরি করা হয়, যা "জুলাই সনদেও" অন্তর্ভুক্ত ছিল।রাজনৈতিক ভেরিফিকেশন বাতিল: সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনে প্রার্থীর পরিবারের রাজনৈতিক মতাদর্শ যাচাইয়ের সনাতন বৈষম্যমূলক নিয়মটি বাতিল করার সুপারিশ করা হয়।
বলপ্রয়োগের নতুন নীতিমালা: আন্দোলনে নির্বিচার গুলি বা মারণাস্ত্রের ব্যবহার বন্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী আধুনিক প্রযুক্তি (যেমন সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান) ব্যবহারের নির্দেশনাসহ নতুন নীতিমালা প্রস্তাব করা হয়।
কার্যক্রমের পৃথকীকরণ: মামলার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার সংস্কৃতি বন্ধে পুলিশের 'অপরাধ তদন্ত' এবং 'আইনশৃঙ্খলা রক্ষা' বিভাগকে সম্পূর্ণ আলাদা করার রূপরেখা তৈরি করা হয়।অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে একটি দৃশ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের যে কড়া সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল, তা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী রূপরেখা ছিল।
কিন্তু এই সংস্কারকে যদি আমরা কেবল পোশাক পরিবর্তন, বদলি বা কিছু নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে ব্যর্থ হতে বাধ্য।পরবর্তী সময়ে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাবিত এই মৌলিক রূপান্তরগুলোর গতি অনেকটাই মন্থর হয়ে পড়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত 'স্বাধীন পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ' ও গভীর কাঠামোগত সংস্কারগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি।
একটি দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত হলো ভয়হীন সামাজিক পরিবেশ। পুলিশকে রাজনৈতিক বন্দিদশা থেকে মুক্ত না করে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার আশা করা অবান্তর।
যতক্ষণ না আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাবিত স্বাধীন পুলিশ কমিশনের মতো কাঠামোগত গলদগুলো আইনগতভাবে চিরতরে দূর করতে পারছি, ততক্ষণ কেবল ক্ষমতার হাতবদল হবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা চিরকালই অধরা থেকে যাবে।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment