'ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাত শহীদের স্মরণে প্রত্যয়ে দীপ্ত কোম্পানীগঞ্জ'
সাত শহীদের স্মরণে কোম্পানীগঞ্জের ইতিহাস অনুপ্রেরণায় এক ঐতিহাসিক ছাত্র যুব সমাবেশ :
মোঃ আল এমরান
শীতের কুয়াশা ভেজা এক সকাল। ডিসেম্বরের নরম আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি,
কোম্পানীগঞ্জের আকাশে ধূসর পর্দা ভেদ করে যখন সোনালি রোদ উঁকি দিচ্ছে, ঠিক তখনই বসুরহাট এ.এইচ.সি হাই স্কুল মাঠে জমে উঠছে মানুষের ঢল।
কণ্ঠে শ্লোগান নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর, কপালে ফিতা,হাতে ফেস্টুন,সবকিছু মিলিয়ে এক অনন্য দৃশ্য।এই সকালটি কোনো সাধারণ দিনের নয়, এটি স্মৃতির,শোকের এবং দৃঢ় প্রত্যয়ের।
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর নিহত সাতজন ছাত্রশিবির কর্মীর স্মরণে ১৩ ডিসেম্বর সকাল ৯টা থেকে অনুষ্ঠিত হলো আলোচনা ও দোয়া এবং ঐতিহাসিক ছাত্র যুব সমাবেশ। সময়ের ব্যবধানে স্মৃতি ম্লান হয়নি বরং আরও দৃঢ় হয়ে উঠেছে।
২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর কোম্পানীগঞ্জের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বসুরহাট এলাকায় সংঘটিত সহিংসতায় তৎকালীন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাতজন কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
তারা ছিলেন,সাইফুল ইসলাম, মতিউর রহমান, রাসেল, চরহাজারীর সজীব, বসুরহাট পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রায়হান,শহীদুল ইসলাম ও মিতুল।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার ফাঁসির প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে।বসুরহাট মডেল স্কুল এলাকা থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি বসুরহাট থানা সংলগ্ন হাসপাতাল রোডের উপজেলা মসজিদের সামনে গেলে পুলিশের সঙ্গে
উত্তেজনা তৈরি হয়।একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, লাঠিচার্জ ও রাবার বুলেট নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।সংঘর্ষের সেই উত্তপ্ত মুহূর্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সাতজন শিবির কর্মী।সেদিন
কোম্পানীগঞ্জের মাটি ভিজে যায় তরুণ রক্তে যা আজও মানুষের স্মৃতিতে জ্বলজ্বলে।
এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের ক্ষত শুকায়নি। প্রতি বছর ডিসেম্বর এলেই,
কোম্পানীগঞ্জ যেন ফিরে যায় সেই রক্তাক্ত সকালের কাছে।শহীদদের স্মরণে আয়োজন হয় আলোচনা, দোয়া। যেন ইতিহাসকে ভুলে না যাওয়ার শপথ।১৩ ডিসেম্বরের এই আয়োজন ছিল সেই ধারাবাহিক স্মরণ প্রয়াসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সকাল থেকেই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে মিছিল এসে জড়ো হতে থাকে বসুরহাট এ.এইচ.সি হাই স্কুল মাঠে। কপালে বাঁধা ফিতা, হাতে ফেস্টুন যেখানে লেখা রয়েছে জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় শহীদ নেতাদের ছবি,নাম ও বাণী।
শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। তবে চোখে পড়ার মতো বিষয় ছিল,হাজারো মানুষের উপস্থিতির মাঝেও ছিল শান্তি ও শৃঙ্খলা। কোনো বিশৃঙ্খলা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত আবেগ আর সম্মিলিত স্মরণ।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় পবিত্র আল কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে, যা পরিবেশন করেন হাফেজ সালমান ফারসী সাথী। কোরআনের আয়াত উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো মাঠে নেমে আসে এক আধ্যাত্মিক নীরবতা। এরপর আল আমীন শিল্পী গোষ্ঠী পরিবেশন করে হামদ।শব্দ আর সুরে যেন আবেগ নতুন মাত্রা পায়।
স্বাগত বক্তব্য দেন আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, শহীদদের স্মরণ কেবল অতীত দেখার বিষয় নয়,এটি ভবিষ্যতের পথনির্দেশ। আত্মত্যাগের ইতিহাস থেকেই জন্ম নেয় নতুন প্রত্যয়।
সমাবেশের প্রধান অতিথি ছিলেন জনাব নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির,কেন্দ্রীয় কমিটি। তার বক্তব্যে উঠে আসে আত্মত্যাগ, আদর্শ ও ইতিহাসের কথা।তিনি বলেন,আমরা দ্বীন ইসলাম কায়েমের জন্য কাজ করি।
মৃত্যু আমাদের কাছে ভয় নয় বরং এটি আমাদের বিশ্বাসের অংশ। শহীদের মৃত্যু তামান্না আমরা কামনা করি।তিনি আরও বলেন,মায়ের উদর থেকে আমরা মৃত্যু নিয়েই এসেছি। কোম্পানীগঞ্জের মাটি শহীদের রক্তে উর্বর। যে রক্ত ঝরেছে, তা কখনো বৃথা যাবে না।তার বক্তব্যে উপস্থিত নেতা কর্মীদের মাঝে দৃঢ় প্রত্যয়ের সঞ্চার হয়।
নোয়াখালী জেলা আমির তার বক্তব্যে বলেন,
২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর আমাদের সাতজন কর্মী শহীদ হয়েছেন। সেই আত্মত্যাগ আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দেবে। এই রক্ত ইসলামের বিজয়ের পথে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।তিনি সামনে আসন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আদর্শিক সংগ্রামের কথাও তুলে ধরেন।
সমাবেশে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও বক্তব্য দেওয়া হয়। আবেগে ভারী সেই কণ্ঠে ছিল না কোনো রাজনীতি,ছিল সন্তান হারানোর বেদনা, গর্ব আর নীরব চোখের জল। উপস্থিত হাজারো মানুষ নীরবে শ্রদ্ধা জানায়।
সমাবেশে কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন।
বিশেষ অতিথি ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ছিলেন,
এইচ. এম. আবু মুসা,কেন্দ্রীয় শিল্প ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক।আনিসুর রহমান, কেন্দ্রীয় বায়তুল মাল সম্পাদক। আবু ছায়েদ সুমন, কেন্দ্রীয় তথ্য সম্পাদক।
হাবিবুর রহমান, কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও সভাপতি, নোয়াখালী জেলা শহর।
মাজহারুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক (জিএস), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সবাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিনিধি।
বিশেষ মেহমান (জামায়াতে ইসলামী):
ইসহাক খন্দকার, আমীর, নোয়াখালী জেলা ও নোয়াখালী–৪ আসনের এমপি প্রার্থী।
ইসমাইল হোসেন মানিক, সহকারী সেক্রেটারি, নোয়াখালী জেলা।অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেন, আমীর, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও নোয়াখালী–৫ আসনের এমপি প্রার্থী।অধ্যক্ষ ফখরুল ইসলাম মিলন, আমীর, কবিরহাট উপজেলা।মাওলানা মোশারফ হোসেন, আমীর, বসুরহাট পৌরসভা জামায়াতে ইসলামী।
মাওলানা মিজানুর রহমান, সেক্রেটারী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামী।
স্থানীয় ও সাবেক নেতৃবৃন্দ ছিলেন,
সাকিল হোসেন, সভাপতি, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রশিবির।আবু তাহের, সভাপতি, কবিরহাট উপজেলা ছাত্রশিবির।গোফরান উদ্দিন, মেসবাহুল আলম, শাফায়াত হোসেন শাহীন, মনিরুল ইসলাম।
নোয়াখালী জেলা দক্ষিণের সাবেক নেতৃবৃন্দ।
মাওলানা গোলাম ফয়সাল, অফিস সম্পাদক, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামী।
কাজী মোহাম্মদ হানিফ,চেয়ারম্যান, ২নং চরপার্বতী ইউনিয়ন পরিষদ।মাওলানা ইয়াকুব হোসেন, জিয়াউল হক জিয় সাবেক সভাপতি নোয়াখালী জেলা দক্ষিন। মাওলানা মহিউদ্দিন, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা এবিএম হেলাল উদ্দিন, সেক্রেটারি, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামী।
মাওলানা ইয়াসিন, সেক্রেটারি, কবিরহাট উপজেলা জামায়াতে ইসলামী। মাওলানা এনায়েত উল্লাহ, নায়েবে আমীর, কবিরহাট উপজেলা জামায়াতে ইসলামী।আব্দুল্লাহ ফয়সাল সাবেক কেন্দ্রীয় ছাএ কল্লান সম্পাদক। মিরাজুল ইসলাম ও নুরুল ইসলাম সাবেক সভাপতি নোয়াখালী জেলা দক্ষিন।
মাওলানা মিজানুর রহমান সেক্রেটারী কোম্পানীগঞ্জ
উপজেলা জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়াও আনোয়ার হোসেন, জহির উদ্দিন, মাওলানা জহির উদ্দিন, ওয়েজ করনী সোহেল।সাইফ উল্লাহ সোহেল সহ নের্তৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন হাফেজ সাইফুর রসূল ফুহাদ,সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, নোয়াখালী জেলা দক্ষিণ।অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাইদ বিন জহির।
বসুরহাটের সেই মাঠে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে,ইতিহাস থেমে থাকে না। রক্ত, স্মৃতি আর প্রত্যয় মিলিয়েই সে সামনে এগোয়। ২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বরের সাতটি প্রাণ আজ নেই, কিন্তু তাদের স্মৃতি আজও কোম্পানীগঞ্জের বাতাসে ভাসে।এই সমাবেশ ছিল শুধু স্মরণ নয়,ছিল ইতিহাসকে নতুন করে পাঠ করার এক দৃঢ় প্রয়াস।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment