ক্ষমতার লঙ্কা আর রাবণের গল্প,আমাদের ভাঙা-গড়ার রাজনীতি:
মামুন নায়েক
আমাদের দেশে একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে,-যে যায় লঙ্কায়, সে-ই হয় রাবণ।আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে এই কথার সত্যতা বারবার প্রমাণিত হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার আন্দোলন-সব কিছুর পেছনে আসলে মূল কারণ একটাই ক্ষমতার দাপট, চরম বৈষম্য আর সাধারণ মানুষের ওপর শোষণের অত্যাচার।ইতিহাসের একটা বিষয় আমাদের পরিষ্কার বোঝা দরকার।
১৯৭১ সালে কিন্তু পুরো পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েনি। অন্যায়-অত্যাচার যা করার তা করেছিল ক্ষমতার চেয়ারে বসা শাসকগোষ্ঠী আর তাদের সেনাবাহিনী।
আইয়ুব খানের আমলে যেমন নিয়ম ছিল নিজের এলাকা, নিজের গোত্রের মানুষকে সব বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া, ঠিক একই জিনিস আমরা পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেখেছি।
বিগত সরকারের গোপালগঞ্জ-কেন্দ্রিক তোষণ আর প্রশাসনকে দলীয়করণের নীতি যেন আইয়ুব খানের সেই বৈষম্যমূলক শাসনকেই মনে করিয়ে দেয়।শুধু আগের সরকার কেন, আমাদের পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাতেই আজ এক নবাগত বৈষম্য আমরা দেখতে পাই।
সরকারদলীয় এমপি-মন্ত্রীরা যখন কোটি কোটি টাকার বাজেট পান, তখন বিরোধী দলের এমপিরা নিজ এলাকার উন্নয়নের জন্য সামান্য বরাদ্দ থেকেও বঞ্চিত হন। তাহলে প্রশ্ন জাগে, আইয়ুব খান খারাপ কোথায় ছিলেন?
তিনিও তো ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন-নিজের অনুগতদের সুবিধা দিয়েছেন, আর বিরোধীদের কোণঠাসা করেছেন। ক্ষমতার এই চরিত্র ১৯৭১ সালেও যা ছিল, আজ এত বছর পরেও তার কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি।
দেশের মানুষ যখনই দেখে রাষ্ট্রটা বা বাজেটটা নির্দিষ্ট কোনো দল বা গোষ্ঠীর বাপের সম্পত্তি হয়ে যাচ্ছে, তখনই তারা রাজপথে নেমে আসে এবং রক্ত দিয়ে তার জবাব দেয়।এই ক্ষমতার খেলায় প্রতিবেশী দেশ ভারতের ভূমিকাও সবসময় সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
৭১ সালে তাদের সাহায্য যেমন সত্যি, তেমনি পরবর্তী সময়ে নিজেদের স্বার্থে এ দেশের একটা স্বৈরাচারী সরকারকে অন্ধভাবে সমর্থন দিয়ে যাওয়াটাও একটা বড় বাস্তবতা। আমাদের দেশের দলগুলো যখন দেশের চেয়ে নিজের ক্ষমতা টেকানোকে বড় করে দেখে, তখন বাইরের শক্তিগুলো বাংলাদেশকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়ে যায়।
সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কথা বলে ক্ষমতায় আসে, কিন্তু চেয়ারে বসলেই সব ভুলে যায়। শুরু হয় লুটপাট, খুন, চাঁদাবাজি আর টাকা পাচার। আইয়ুব খানকে তাড়িয়ে আমরা দেশ স্বাধীন করলাম, এরশাদকে তাড়ালাম, এবার হাসিনাকেও তাড়ালাম। কিন্তু লাভ কী হলো?
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ না হয়ে যদি শুধু 'মানুষ বদল' বা 'দল বদল' হয়, তবে সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায় না। আমাদের এই ক্ষমতার নোংরা লড়াইকে যদি ব্যঙ্গ করে বলি-তবে তো একেকজন নেতার পতনের পর একেকটা জেলাকে আলাদা দেশ ঘোষণা করা উচিত ছিল!
তাহলে বাংলাদেশ নিজেই একটা মহাদেশ হয়ে যেত, আর তার ভেতর থাকত ছোট ছোট অনেক দেশ।কিন্তু আইয়ুব খানের অন্যায়ের কারণে আমরা পাকিস্তানের বিরোধিতা করে নতুন দেশ চেয়েছিলাম, কারণ ওটা আমাদের দেশ ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরের শাসকের পাপের কারণে তো আমরা নিজের দেশের বিরোধিতা করতে পারি না।
বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট দল বা শাসকের নয়, এটা এ দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের।আমরা 'জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক'। দেশটা যখনই সংকটে পড়ে, সাধারণ মানুষ সব বিভেদ ভুলে এক হয়ে বলে 'সবার আগে বাংলাদেশ'।
২০২৪ সালের এতগুলো প্রাণের বলিদানের পর আমাদের এখন একটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত-রাষ্ট্রের নিয়মকানুন ও ব্যবস্থার সংস্কার করা। দলগুলোর এই বস্তাপচা, ব্যক্তি কেন্দ্রিক রাজনীতি এবার বন্ধ হতে হবে। ক্ষমতার চেয়ারে গিয়ে 'রাবণ' হওয়ার এই যে পুরোনো অভ্যাস, তা যদি এবার আমরা ভাঙতে না পারি, তবে এই রক্তক্ষয়ী ইতিহাস বারবার ফিরে আসবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না।
মামুন নায়েক,
তরুণ সংগঠক, রাজনীতি বিশ্লেষক ও সমাজকর্মী।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment