সিরাজপুরে বিএনপির মনোনয়ন ঘিরে তীব্র সমীকরণ
মোহাম্মদ উল্যা
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রবীণ-নবীনের লড়াই, অতীত রাজনৈতিক পরিচয় ও বিতর্কে আলোচনায় একাধিক প্রার্থী
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর সিরাজপুর ইউনিয়নে বিএনপির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। দলীয় মনোনয়ন পেতে প্রবীণ ও নবীন একাধিক নেতা মাঠে সক্রিয় থাকায় ইউনিয়নের পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে দলীয় নেতাকর্মীদের আড্ডায় এখন প্রধান প্রশ্ন—সিরাজপুরে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন কে?
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনোনয়ন প্রত্যাশীদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক অবস্থান ও অনুসারী রয়েছে। তবে তাঁদের নিয়ে যেমন ইতিবাচক মূল্যায়ন রয়েছে, তেমনি অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনসম্পৃক্ততা ও ব্যক্তিগত বিতর্ক নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা। ফলে শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত কোন দিকে যায়, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে তৃণমূলে।
মনোনয়ন দৌড়ে আলোচনায় থাকা আফতাব আহমেদ বাচ্চু উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও দীর্ঘদিনের রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। দলের কঠিন সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁর সমর্থকেরা। তবে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের সক্রিয়তা, সালিশ-বিচারে ভূমিকা এবং সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে একাংশের প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত—এমন দাবি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা থাকলেও বিষয়টি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাইন উদ্দিন মাসুম সিরাজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি। তৃণমূলের একজন ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের বিএনপি নেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ তাঁর অন্যতম শক্তি বলে মনে করেন অনুসারীরা। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কতটা কার্যকর হবে—এসব বিষয় নিয়েও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
অন্যদিকে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয় গোলাম ছারওয়ার মিশুকে ঘিরেও চলছে নানা আলোচনা। স্থানীয় প্রতিপক্ষদের পক্ষ থেকে তাঁর অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন দাবি করা হচ্ছে। কেউ কেউ তাঁর ছাত্রশিবির ও পরবর্তীতে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন। আবার দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর দেশে ফিরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। কাতারে অবস্থানকালে অর্থনৈতিক অনিয়মের অভিযোগও প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া না গেলে সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আবদুস সাত্তারকে ঘিরেও রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা। বিএনপি পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা এবং ছাত্রদলের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কথা সমর্থকেরা তুলে ধরলেও, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সিরাজপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন—এমন অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরোধীদের। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর দলীয় অবস্থান ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা নিয়ে তৃণমূলে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট সময়ের দলীয় পদ-পদবি যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।
তরুণ প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন আতাউর রহমান পাভেল। সাবেক ছাত্রদল নেতা হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় এবং রাজপথে সক্রিয়তার বিষয়টি সামনে আনছেন তাঁর সমর্থকেরা। তরুণদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা ও তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে তাঁর শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বয়স ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করছেন দলের একাংশ।
এদিকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও গণসংযোগ বাড়িয়েছেন। কেউ দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, কেউ তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত্তি, কেউ তরুণ নেতৃত্ব এবং কেউ অতীত রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সিরাজপুরে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে শুধু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নয়—দলের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্য, সাংগঠনিক সক্ষমতা, ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক অতীত, বিতর্কমুক্ত ভাবমূর্তি এবং নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তৃণমূল বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর প্রত্যাশা, দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত প্রভাবের পরিবর্তে মাঠের বাস্তবতা ও প্রার্থীর জনগ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যেসব প্রার্থীকে ঘিরে অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা বা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোও যথাযথভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
সব মিলিয়ে সিরাজপুর ইউনিয়নে বিএনপির মনোনয়ন এখন শুধু একজন প্রার্থী নির্বাচনের বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে দলের সাংগঠনিক শক্তি, তৃণমূলের আস্থা এবং নির্বাচনী কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত দল কাকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে সিরাজপুরের নির্বাচনী মাঠে বিএনপির কৌশল ও সম্ভাবনার বড় একটি অংশ।
তবে স্থানীয় ভোটারদের প্রত্যাশা একটাই—দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি সৎ, যোগ্য, জনসম্পৃক্ত ও বিতর্কমুক্ত একজন প্রার্থীকে সামনে আনা হোক; যিনি নির্বাচনের পরও জনগণের পাশে থাকবেন এবং ইউনিয়নের উন্নয়ন ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment