কোম্পানীগঞ্জে মাদ্রাসাছাত্রকে নির্যাতনের অভিযোগ, পরিচালকের দাবির সঙ্গে মিলছে না বেতন পরিশোধের মেমো
মোহাম্মদ উল্যা
বিশেষ প্রতিনিধি
৯ বছরের শিশু আদিবকে মাসের পর মাস ‘টর্চার সেলে’ নির্যাতনের অভিযোগ মায়ের, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড়
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সিরাজপুর ইউনিয়নের লোহারপুল এলাকার দারুস সালাম মডেল মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের নবম পারার ছাত্র ৯ বছর বয়সী আরাফাত হোসেন আদিবকে নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মাদ্রাসার পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ও শিক্ষক শাব্বির আহমেদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেছেন শিশুটির মা আয়েশা আক্তার। তাঁর অভিযোগ, মাদ্রাসার একটি কথিত ‘টর্চার সেলে’ নিয়ে মাসের পর মাস আদিবের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে বলে দাবি করেছেন তার স্বজনেরা। বর্তমানে সে শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে, অভিযোগ প্রকাশের পর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে, আদিবকে পাঁচ বছর ধরে বিনা বেতনে পড়ানো ও খাওয়ানো হয়েছে। তবে এ দাবির সঙ্গে পাওয়া বেতন পরিশোধের একটি মেমোর তথ্যের অসংগতি দেখা গেছে।
প্রতিবেদকের হাতে আসা মেমো অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের খাবার খরচসহ দুই মাসের জন্য আদিবের আট হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থাৎ মেমোটি অন্তত ওই দুই মাসের অর্থ পরিশোধের প্রমাণ বহন করে। তবে আগের মাস ও বছরগুলোর বেতন পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট হিসাবপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। আদিবের বর্তমান বয়স মাত্র ৯ বছর। তাকে পাঁচ বছর ধরে বিনা মূল্যে পড়ানো ও খাওয়ানোর দাবি করা হলে ভর্তির সময়, বয়স এবং আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে এসব দাবির স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে পড়ানো বা খাওয়ানো হলেও তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানোর অধিকার কারও নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা দেওয়া, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করা; ভয়ভীতি কিংবা নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে শিশুটির চিকিৎসা প্রতিবেদন, শারীরিক আঘাতের ধরন, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজ এবং আর্থিক নথিপত্র গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত পরিচালক ও শিক্ষকের বক্তব্যও জানা জরুরি।
একটি শিশুর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কোনো বিতর্ক, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার আড়ালে চাপা পড়ে যেতে পারে না। তাই বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
শিশু নির্যাতনের অভিযোগ কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। আদিবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তার যথাযথ চিকিৎসা এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment