'দেশপ্রেম, চরিত্র ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার সংকট'
মোঃ আল এমরান
নব জ্যোতি আর্টিকেল ডেস্ক:
দেশকে ভালোবাসা মানে শুধু পতাকা হাতে স্লোগান দেওয়া নয়, শুধু দলীয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে দুর্নীতিবিরোধী ভাষণ দেওয়া নয়, কিংবা কেবল ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়াও নয়।
প্রকৃত দেশপ্রেম শুরু হয় দেশের মানুষকে ভালোবাসা থেকে, ন্যায়কে গ্রহণ করা থেকে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার মাধ্যমে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে আজ দেশপ্রেম বিভক্ত। এখানে দেশ নয়, দলই মুখ্য। মানুষ দলান্ধ হয়ে পড়েছে যুক্তির জায়গায় আবেগ, নৈতিকতার জায়গায় আনুগত্য এবং বিবেকের জায়গায় সুবিধাবাদ স্থান করে নিয়েছে।
ফলে দেশপ্রেম একটি সার্বজনীন চেতনা না হয়ে একেক দলের একেক রকম ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আমরা প্রতিদিন শুনি, চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতি দেশের বড় সমস্যা।
সভা-সমাবেশে, ওয়াজ-মাহফিলে, রাজনৈতিক স্টেজে এসব কথার অভাব নেই। কিন্তু বাস্তবে চিত্র যেন ঠিক উল্টো। যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে, সুযোগ পেলে অনেকেই সেই দুর্নীতির অংশ হয়ে যায়। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য মুখে নীতি, হাতে অনিয়ম।
ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস, থানাসহ প্রায় সব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানেই ঘুষ যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ন্যায়বিচারের জায়গা সালিশ-বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে।
তদবির ছাড়া কাজ হয় না,এমন ধারণা সমাজে এতটাই গেঁথে গেছে যে মানুষ এটিকে অন্যায় নয়, বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিচ্ছে। এই মানসিক পরাজয়ই সবচেয়ে ভয়ংকর।
আমরা প্রায়ই উন্নত দেশের উদাহরণ দিই, তারা কীভাবে উন্নত হলো, কীভাবে শৃঙ্খলা গড়ে তুলল। কিন্তু আমরা একটি মৌলিক বিষয় এড়িয়ে যাই। তাদের উন্নয়নের মূল ভিত্তি ছিল ব্যক্তি চরিত্র। আইন সেখানে কঠোর, কিন্তু তার চেয়েও কঠোর মানুষের নৈতিকতা। সেখানে নিয়ম ভাঙা শুধু আইনগত অপরাধ নয়, সামাজিক লজ্জার বিষয়।
অথচ আমাদের সমাজে উল্টো চিত্র। এখানে দুর্নীতিবাজ প্রভাবশালী হলে সে সম্মান পায়, আর সৎ হলে তাকে বোকা মনে করা হয়। ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যেখানে ধনীরা আরও ধনী হয়, গরিবেরা আরও গরিব হয়।
এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়,এটি ন্যায়বিচার ও সুযোগের বৈষম্য। আমরা নিজেদের ধর্মপ্রাণ জাতি বলে গর্ব করি। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ওয়াজ ও আলোচনার কোনো অভাব নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ধর্ম কি শুধু আচারেই সীমাবদ্ধ? নৈতিকতা, সততা ও ন্যায়বোধ কি ধর্মের মূল শিক্ষা নয়? বাস্তবতা হলো, ধর্ম আমাদের জীবনে আছে, কিন্তু তার হেদায়েত অনুপস্থিত।
ব্যক্তি চরিত্রে ধর্মের প্রতিফলন কম। ফলে সমাজে দ্বিচারিতা বাড়ছে, বাইরে ধার্মিক, ভেতরে সুবিধাবাদী। এই সংকট শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নয়,এটি নৈতিক ও আত্মিক সংকট। আজ দেশে এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, একেক দল শুধু নিজেদের লোকদেরই “খাঁটি দেশপ্রেমিক” মনে করে।
ভিন্নমত মানেই যেন দেশদ্রোহ। এই সংকীর্ণতা রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর, কারণ রাষ্ট্র টিকে থাকে বহুমতের সহাবস্থানে ও ভিন্ন চিন্তার সম্মানে।
দেশপ্রেম কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়। দেশপ্রেম হলো, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করা, নিজের লোক হলেও ভুলকে ভুল বলা এবং ক্ষমতার কাছে নত না হওয়া। যে ব্যক্তি সৎ, যোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ, তিনিই প্রকৃত দেশপ্রেমিক, তিনি যে দলেই থাকুন না কেন।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। প্রথমত, আমাদের দলান্ধতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিজের জীবন থেকেই সততার চর্চা শুরু করতে হবে। ঘুষ না দেওয়া, অন্যায় তদবির না করা, এসব ছোট সিদ্ধান্তই বড় পরিবর্তনের সূচনা।
রাষ্ট্র শুধু সরকার দিয়ে গঠিত নয়,রাষ্ট্র আমরা সবাই। আমাদের নৈতিক মান উন্নত না হলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন জানে,এই দেশ কেবল ধনীদের জন্য নয়,এই রাষ্ট্র ন্যায়ের ওপর দাঁড়ানো।
দেশকে ভালোবাসা মানে দেশের মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায় বিচারকে ভালোবাসা। যদি আমরা সত্যিই একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র চাই, তবে আগে আমাদের নিজেদের আয়নায় তাকাতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কী ধরনের নাগরিক হতে চাই?
উত্তর যদি সৎ, ন্যায়বান ও দায়িত্বশীল হয়, তবে পরিবর্তন আসবেই।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment