কোম্পানীগঞ্জে আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ ও নির্বাচনকালীন ঝুঁকি:
মোঃ আল এমরান
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আজ নানামুখী সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার মুখোমুখি। অবৈধভাবে মাটি কাটা, বালু উত্তোলন, দাগী আসামিদের প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা, কিছু বাজারকে কেন্দ্র করে মাদক বিক্রির সিন্ডিকেট,শালিশ বাণিজ্য ও ভূমিদস্যুতার মতো অপরাধ,সব মিলিয়ে এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক সাধারণ মানুষের মনে বাসা বেঁধেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত একটি অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ বা মতাদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই।
অধিকাংশ দলই গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার রক্ষার কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, মাঠপর্যায়ে কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পেশিশক্তি ও অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
এতে করে রাজনীতির আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ হারাচ্ছে নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার।
কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন এখন যেন প্রকাশ্য ঘটনা। নদী ও কৃষিজমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অথচ কার্যকর প্রতিরোধ চোখে পড়ে না।
স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজে জড়িতদের একটি অংশ প্রভাবশালী হওয়ায় প্রশাসনিক তৎপরতা অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। একইভাবে দাগী আসামিদের গ্রেপ্তারে ধীরগতি জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে,আইন কি সবার জন্য সমান।
আরেকটি বড় সামাজিক ব্যাধি হলো মাদক। কিছু বাজার ও জনবহুল এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মাদক সিন্ডিকেট কেবল যুবসমাজ নয়, পুরো সমাজ কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্তরা অনেক সময় ভয়ভীতি, হুমকি ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে। এতে করে প্রতিবাদী কণ্ঠ রুদ্ধ হয়, ভুক্তভোগীরা নীরব থাকতে বাধ্য হন।
শালিশ বাণিজ্য ও ভূমিদস্যুতাও কোম্পানীগঞ্জে নতুন কিছু নয়। প্রভাবশালী মহল নিজেদের স্বার্থে শালিশকে ব্যবহার করে দুর্বল পক্ষকে চাপে ফেলে। জমি দখল, জাল দলিল, ভয়ভীতি,এসব যেন পুরনো বন্দোবস্তের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এতে করে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন কোম্পানীগঞ্জে বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। টাকা দিয়ে ভোট কেনা, ভোটারদের হুমকি দেওয়া, কেন্দ্র দখল, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আগাম ও কার্যকর নজরদারি না থাকলে পরিস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিত দিকে মোড় নিতে পারে।
এখানে জোর দিয়ে বলতে হয়,এই লেখা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। এটি একটি নাগরিক উদ্বেগের প্রতিফলন।
নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ থেকে তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।
কোম্পানীগঞ্জের মানুষ শান্তি চায়, নিরাপদ পরিবেশ চায়, একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে এখনই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অভিযান, দাগী আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কঠোর নজরদারি জরুরি।
নইলে আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা কেবল অপরাধীকেই উৎসাহিত করবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের অধিকার। রাষ্ট্র যদি সত্যিই শক্তিশালী হতে চায়, তবে আইনের শাসনকে কাগজে নয়,মাঠে প্রমাণ করতে হবে। কোম্পানীগঞ্জ সেই পরীক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment