মাজহাবের উদারতা বনাম রাজনীতির সুবিধাবাদ, একটি তুলনামূলক ব্যবচ্ছেদ:
লেখক, মামুন নায়েক
কলামিস্ট ও অ্যাক্টিভিস্ট।
একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তির উৎস যেমন সংবিধান, তেমনি মুসলিম জীবন দর্শনের মূল ভিত্তি পবিত্র আল-কুরআন ও রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ।
গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দুইয়ের প্রয়োগ এবং এক শ্রেণির মানুষের ব্যাখ্যার ধরনে একটি অদ্ভুত কিন্তু উদ্বেগজনক সাদৃশ্য বিদ্যমান। বিশেষত সংসদীয় রাজনীতি এবং কিছু তথাকথিত ধর্মীয় বক্তার বয়ানে এই মিল স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ধারা ও হাদিসের শক্তি দুর্বলতার অপপ্রয়োগ
একটি সংবিধানে বিভিন্ন ধারা থাকে। এর মধ্যে কিছু ধারা রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে অত্যন্ত শক্তিশালী
যেমন সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদ, যা মৌলিক কাঠামোকে সুরক্ষা দেয়।
আবার কিছু ধারা বা উপধারা রয়েছে, যেগুলো নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমুখী ব্যাখ্যা ও বিতর্ক বিদ্যমান। যেমন ৭০ অনুচ্ছেদ, যা সংসদ সদস্যদের দলীয় অবস্থানের বাইরে মত প্রকাশে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।
দুঃখজনকভাবে, রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় নিজেদের স্বার্থে এসব ধারাকে ব্যবহার করে এক ধরনের জটিল ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
একই চিত্র দেখা যায় হাদিস শাস্ত্রেও।
হাদিসের বিশাল ভাণ্ডারে বর্ণনাকারীর নির্ভর যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে হাদিসগুলোকে সহিহ 'শক্তিশালী', হাসান 'মধ্যম'এবং যইফ 'দুর্বল'হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সাধারণত সহিহ হাদিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন কিছু বক্তা নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সহিহ হাদিস উপেক্ষা করে দুর্বল কিংবা জাল বর্ণনাকে সামনে নিয়ে আসেন। উদাহরণস্বরূপ,দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ,এই কথাটি ভিত্তিহীন হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় হাদিস হিসেবে প্রচার করা হয়। এ ধরনের অপব্যাখ্যা ধর্মের সৌন্দর্যকে ক্ষুণ্ণ করে এবং মানুষের বিশ্বাসকে বিভ্রান্ত করে।
অন্যদিকে, ইসলামের স্বর্ণযুগে মাজহাবের ইমামগণের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনুসরণযোগ্য। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফিই, ইমাম মালিক এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.),তাঁরা প্রত্যেকেই কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে গভীর গবেষণা ও ইজতিহাদের মাধ্যমে মতামত প্রদান করেছেন।
তাঁদের মধ্যে মতভেদ ছিল, কিন্তু তা কখনো বিভেদে রূপ নেয়নি। বরং তা ছিল জ্ঞানভিত্তিক ও পরস্পরের প্রতি সম্মানপূর্ণ। একজন ইমাম যে বিষয়ে একটি মত দিয়েছেন, অন্য ইমাম সেখানে ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করলেও, কেউ কাউকে খাটো করেননি বা প্রতিপক্ষ বানাননি।
রাজনীতির ময়দানে যেখানে প্রতিপক্ষকে ‘মাইনাস’ করার প্রবণতা প্রবল, সেখানে মাজহাবের ইমামগণ শিখিয়েছেন সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জ্ঞানচর্চার সৌন্দর্য। তাঁদের এই বৈচিত্র্য মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত এবং সহজতার পথ উন্মুক্ত করেছে।
বর্তমান রাজনীতি যেখানে ‘প্লাস-মাইনাস’ ও ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ, সেখানে মাজহাব আমাদের শেখায় ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে। রাজনীতি যখন ব্যক্তিস্বার্থে সংবিধানের অপব্যাখ্যা করে, তখন রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে, যখন ধর্মকে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখন বিশ্বাসের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই ক্রান্তিকালে আমাদের প্রয়োজন মাজহাবের ইমামগণের উদারতা, জ্ঞাননিষ্ঠা ও সহনশীলতা। মতভেদ থাকবেই, কিন্তু তা যেন বিভক্তির কারণ না হয়ে পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের ভিত্তি গড়ে তোলে,এটাই একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment