মৌলভীবাজার ওবায়দিয়া ইসলামীয়া মাদরাসায় ছবক ও গুণীজন সম্মাননা প্রদান:
নব জ্যোতি রিপোর্ট ডেস্ক :
শীতের সকাল মানেই প্রকৃতির এক মায়াবী আবরণ। নীলচে কুয়াশার পর্দা ভেদ করে সূর্যের প্রথম আলো যখন শিশিরভেজা ঘাসে এসে পড়ে, তখন চারপাশে জন্ম নেয় এক অনাবিল সৌন্দর্য ও প্রশান্তি।
ঠিক এমনই এক সৌন্দর্যময় সকালে, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ শনিবার সকাল ১০টায়, মৌলভীবাজার ওবায়দিয়া ইসলামীয়া মাদরাসার বিস্তৃত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শিক্ষার্থীদের ছবক অনুষ্ঠান ও গুণীজন সম্মাননা স্মারক প্রদান উপলক্ষে এক ব্যতিক্রমধর্মী ও হৃদয়ছোঁয়া আয়োজন।
শিক্ষার্থীদের কোলাহল, অভিভাবকদের আগমন, অতিথিদের পদচারণা এবং পবিত্র কোরআনের সুমধুর তেলাওয়াত সব মিলিয়ে মাদরাসা প্রাঙ্গণ যেন পরিণত হয় ধর্ম, শিক্ষা ও মানবিকতার এক অপূর্ব মিলনমেলায়।
সকাল ঠিক ১০টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। তেলাওয়াতের সুরে মুহূর্তেই নীরব হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ, আত্মিক প্রশান্তিতে ভরে যায় পরিবেশ।
এরপর মাদরাসার পক্ষ থেকে আগত অতিথিদের ফুল দিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। ফুলের সুবাস ও আন্তরিক শুভেচ্ছায় অনুষ্ঠানস্থল হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ।
অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল গুণীজন সম্মাননা স্মারক প্রদান। ২ নং চরপার্বতী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আমেরিকান প্রবাসী বিশিষ্ট সমাজসেবক মুহাম্মদ ওবায়দুল হক খাঁন-কে সমাজসেবা, শিক্ষা ও মানবিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
সম্মাননা প্রদানের মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন যেখানে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক অনন্য দৃশ্য। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ২ নং চরপার্বতী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মাওলানা কাজী হানিফ আনসারী।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, মাসিক নব জ্যোতি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ আল এমরান, মাদরাসার প্রধান মাওলানা আব্দুল্লাহ, কার্যকরী কমিটির সদস্যবৃন্দ,মাদরাসার উপদেষ্টা কবি আবুল হোসেন সিরাজী, সমাজসেবক ও চাকুরিজীবী আনোয়ার হোসেন, ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বাবু, মাদরাসার সহ-সভাপতি মোঃ নুরুজ্জামান, মৌলভীবাজার স্পোর্টিং ক্লাবের সমন্বয়ক আবদুর রহিম হৃদয়, পল্লী চিকিৎসক আব্দুল্লাহ ও সাইফুল ইসলাম, সৌদি প্রবাসী আব্দুস শহীদ, মাওলানা হাফেজ নজরুল ইসলাম, মাওলানা ওলি উল্লাহ, নেজামসহ মাদরাসার সহকারী শিক্ষকবৃন্দ, অভিভাবক, ছাত্র-ছাত্রী, এলাকার গুণীজন ও মা-বোনেরা।
এই বিপুল উপস্থিতিই প্রমাণ করে,এই মাদরাসা শুধু একটি শিক্ষালয় নয়, বরং পুরো এলাকার বিশ্বাস ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে মাদরাসার প্রধান মাওলানা আব্দুল্লাহ বলেন, আপনারা আপনাদের সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। এই সন্তানরাই একদিন আপনাদের নাজাতের মাধ্যম হবে। আমরা তাদেরকে শুধু পাঠ্যজ্ঞান নয়, আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবো এটাই আমাদের অঙ্গীকার।
বিশেষ অতিথি চরপার্বতীর বর্তমান চেয়ারম্যান মাওলানা কাজী হানিফ আনসারী বলেন, এই প্রতিষ্ঠান শুধু পাঠ্যশিক্ষার জায়গা নয়, এখানে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের শিক্ষা দেওয়া হয়। আমরা চাই, এই শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সমাজের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে উঠুক।
মাসিক নব জ্যোতি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ আল এমরান বলেন, এখানে পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় ও সাধারণ উভয় শিক্ষায় সমৃদ্ধ হতে পারে। এই শিক্ষা তাদের দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগের পথ তৈরি করবে। তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে আরও বলেন, সন্তানদের প্রতি সর্বদা যত্নবান হতে, কারণ সন্তানরা সবচেয়ে বেশি সময় পরিবারেই কাটায়।
সম্মানিত প্রধান অতিথি সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ওবায়দুল হক খাঁন আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আমার চাচাতো বড় ভাই মরহুম এজহারুল হক সাহেব।
যেদিন তাঁর এক ভাই ইন্তেকাল করেন, সেদিনই আমি জন্মগ্রহণ করি। তাঁর নাম ছিল ওবায়দুল হক,সেই নামেই আমার নাম রাখা হয়।তিনি মরহুম প্রতিষ্ঠাতার রূহের মাগফিরাত কামনা করে সকলের প্রতি আহ্বান জানান, এই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে দান ও সহযোগিতায় এগিয়ে আসার জন্য।
তাঁকে সম্মাননা স্মারক দেয়ার জন্য কার্যকরী কমিটি কে ধন্যবাদ জানান এবং অভিভাবকদের উপস্থিতি দেখে সন্তুষ্ট প্রকাশ করেন ও সমাজবাসীকে অভিনন্দন জানান।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ১০ জন কৃতি শিক্ষার্থীকে সম্মাননা প্রদান। অতিথিদের হাত থেকে বই ও সনদ গ্রহণের মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের চোখে ছিল আনন্দের দীপ্তি। এই স্বীকৃতি শুধু একটি পুরস্কার নয়
বরং ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক শক্তিশালী প্রেরণা।
ছবক ও দোয়া-মোনাজাত পরিচালনা করেন কদমতলা হোসাইনিয়া মাদরাসার প্রধান মাওলানা বদরুল আলম। তিনি প্রতিষ্ঠানের জমিন দাতা, প্রতিষ্ঠাতা, দেশি-প্রবাসী দানকারীদের, কার্যকরী কমিটি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করেন। মোনাজাতের সময় আত্মিক আবেশে অনেকের চোখে অশ্রু ঝরে পড়ে।
দোয়া শেষে উপস্থিত সকলের মাঝে নাশতা পরিবেশন করা হয়। কুশল বিনিময়, হাসি ও আন্তরিক আড্ডায় অনুষ্ঠানটি রূপ নেয় এক সামাজিক মিলনমেলায়। মাঠজুড়ে শিক্ষার্থীদের পদচারণা, অভিভাবকদের উচ্ছ্বাস আর অতিথিদের উপস্থিতি মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য চিত্রকল্প।
মায়েদের চোখে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন, বাবাদের মুখে গর্বের হাসি সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়, এটি এক জীবনের দর্শন।
মৌলভীবাজার ওবায়দিয়া ইসলামীয়া মাদরাসার এই ছবক অনুষ্ঠান কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়,এটি ছিল মূল্যবোধ, মানবিকতা ও শিক্ষার এক মহোৎসব।
এই আয়োজন আবারও প্রমাণ করল, যেখানে শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা যুক্ত হয়, সেখানেই জন্ম নেয় আলোকিত মানুষ। আর আলোকিত মানুষই পারে সমাজকে আলোকিত করতে।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment