নব প্রজন্মের আলোর যাত্রা — চৌধুরীহাট ডিগ্রি কলেজে নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক উৎসব
নব জ্যোতি ডেস্ক রিপোর্ট :
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চৌধুরীহাট ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণে ১২ অক্টোবর ২০২৫ ইং রোজ রোববার সকাল থেকেই মুখরিত ছিল উৎসবের রঙে। কচি নবীন মুখের হাসি, প্রবীণদের স্নেহ, শিক্ষকদের শুভাশীষ আর অতিথিদের প্রেরণায় ক্যাম্পাসটি যেন হয়ে ওঠে জ্ঞানের, সংস্কৃতির ও মানবিকতার মিলনমেলা।সকাল ১১টায় শুরু হওয়া নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কলেজ অডিটোরিয়াম পরিণত হয় আনন্দ ও প্রত্যয়ের উজ্জ্বল আসরে। বেলুন, ফুল, ব্যানারে সজ্জিত মঞ্চে সারিবদ্ধভাবে বসেছিলেন অতিথিবৃন্দ, শিক্ষক এবং অভিভাবকরা। নবীন শিক্ষার্থীদের চোখে মুখে ঝিলিক দিচ্ছিল নতুন জীবনের আশাবাদ— উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প।অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন কলেজ কমিটির সভাপতি ও নোয়াখালী বারের সাবেক সভাপতি এডভোকেট আজম খান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কলেজের প্রফেসর সাইফুল্লাহ সোহাগ, যিনি তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানকে ধারাবাহিক ও প্রাণচঞ্চল করে তোলেন।প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও নোয়াখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র হারুনুর রশীদ আজাদ। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেন—“শিক্ষা শুধু চাকরির সুযোগ তৈরি করার মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষ গড়ার এক অবিনশ্বর শক্তি। আমরা যদি নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায় ফিরে যেতে পারি, তাহলে এই সমাজ আলোকিত হবে। আজকের নবীন শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশকে গড়বে। তাই তাদের সৎ, আদর্শবান ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের দায়িত্ব।”প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন নোয়াখালী জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর ইসহাক খন্দকার। তিনি বলেন—
“বর্তমান সমাজে শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই, কিন্তু নৈতিক শিক্ষার অভাব প্রকট। যারা আজ দুর্নীতিতে জড়িত, অনেকেই উচ্চশিক্ষিত, কিন্তু নৈতিকতায় দেউলিয়া। আমাদের নবীন প্রজন্মকে কোরআন-সুন্নাহর আলোয় জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মানবিক গুণে সমৃদ্ধ হতে হবে।”অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন নোয়াখালী-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এমপি প্রার্থী অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেন, নোয়াখালী জেলার সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোঃ ইয়াকুব, নোয়াখালী জেলা বিএনপির সদস্য নুরুল আলম শিকদার, চৌধুরীহাট ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ শেখ সাদি, বসুরহাট পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল মতিন লিটন, উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুর রহমান রিপন, বসুরহাট পৌর জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মোশাররফ হোসাইন, বিএনপি নেতা মমিনুল হক, চরপার্বতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী হানিফ আনসারী, ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম, এডভোকেট কাওছার ইমাম, আলাউদ্দিন ভূঞা, ও কবির আহমদ মেম্বার প্রমুখ।নবীন শিক্ষার্থীদের ফুল ও শুভেচ্ছায় বরণ করা হয়। অনুষ্ঠানস্থল জুড়ে বাজতে থাকে উৎসবের সুর, নবীনদের মুখে হাসি, আর প্রবীণদের চোখে গর্বের দীপ্তি। কলেজের সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে পরিবেশিত হয় মনোমুগ্ধকর সংগীত পরিবেশন করেন গায়কেরা। অনুষ্ঠানের প্রতিটি পরিবেশনা যেন তরুণদের প্রতিভা, প্রাণশক্তি ও দেশপ্রেমের এক অনবদ্য প্রকাশ।কলেজের অধ্যক্ষ শেখ সাদি তাঁর বক্তব্যে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন—
“২৬ বছর আগে যারা এই কলেজ প্রতিষ্ঠায় নিজেদের শ্রম, মেধা ও ত্যাগ উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ আমাদের মাঝে নেই। আমরা তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তাঁদের পরিশ্রম ও স্বপ্নই আজকের এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি। আমাদের দায়িত্ব এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু জ্ঞানের আলোয় নয়, চরিত্র ও মানবিকতার আলোয় আলোকিত রাখা।”
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে আরও বলেন, সমাজে শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও নৈতিক অবক্ষয় বেড়ে চলেছে। নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ছাড়া শিক্ষার কোনো মূল্য নেই। একজন শিক্ষকের একনিষ্ঠ পাঠদান, অভিভাবকের দায়িত্বশীল দিকনির্দেশনা এবং শিক্ষার্থীর অধ্যবসায়— এই তিনটি উপাদানই পারে একটি জাতিকে সমৃদ্ধ করতে।অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, শিক্ষা হলো মানুষের আত্মার উন্নয়ন। যে শিক্ষা মানবতাকে শাণিত করে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহসী করে তোলে, সেই শিক্ষা অর্জন করাই আজকের চ্যালেঞ্জ। তাঁরা নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন—
“তোমরা আলোর সন্তান, তোমাদের কলম, চিন্তা ও চরিত্র দিয়ে অন্ধকার দূর করতে হবে। ভালো মানুষ হতে হবে, দায়িত্বশীল নাগরিক হতে হবে, কারণ তোমরাই আগামী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।”
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নবীন ও প্রবীণ শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে অংশগ্রহণ করে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করেন। তাদের পরিবেশনায় উঠে আসে দেশপ্রেম, মানবতা, ও সময়ের দায়বদ্ধতার সুর। কলেজ চত্বরে একসময় সূর্য অস্ত গেলেও, নবীনদের চোখে তখনও জ্বলজ্বল করছিল ভবিষ্যতের আলো।
দিন শেষে নবীন শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় শুভেচ্ছা সামগ্রী, কলেজের প্রতীকচিহ্ন ও একটি করে ফুল। অনেকেই ছবি তুলেন, কেউ গেয়ে ওঠেন গান, কেউবা স্মৃতির পাতা ভরিয়ে রাখেন সহপাঠীদের সঙ্গে হাসি-আড্ডায়।চৌধুরীহাট ডিগ্রি কলেজের এ নবীন বরণ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এখানে শিক্ষার্থীরা শিখবে কেবল পাঠ্যপুস্তকের অক্ষর নয়, বরং জীবন গড়ার মূল্যবোধ। বক্তাদের কথায়, “যদি শিক্ষকরা সৎ থাকেন, অভিভাবকরা যত্নবান হন, আর শিক্ষার্থীরা অধ্যবসায়ী হয়, তাহলে একদিন এই কলেজই হবে আলোকিত মানবিক সমাজের প্রতীক।”এই দিনটি নবীনদের জীবনে হয়ে থাকুক অনুপ্রেরণার বাতিঘর। চৌধুরীহাট ডিগ্রি কলেজ থেকে যেন বেরিয়ে আসে এমন প্রজন্ম, যারা জ্ঞান, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে দীপ্ত হয়ে সমাজকে করবে আলোকিত।চৌধুরীহাটের আকাশে তাই আজ একটাই উচ্চারণ—“নৈতিকতায় শিক্ষিত হও, জ্ঞানে আলোকিত হও, মানবতায় পরিপূর্ণ হও।”
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment