ঢাকা    ,
সংবাদ শিরোনাম : বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় 'বাসাপ' এর প্রার্থনা মানবিক মূল্যবোধ থেকেই জাতীয় নেত্রীর আরোগ্য প্রত্যাশা : “ভোগান্তির আরেক নাম মৌলভীবাজার টু কাজীরহাট স্লুইসগেট দুই যুগের কান্না : হাজ্বী আবুল খায়ের দাখিল মাদরাসায় পাঠ পরিকল্পনা, দোয়া ও অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত: হাকিম মাওলানা ইলিয়াস (রাঃ) ইউনানী চিকিৎসার বাতিঘর,আর তাঁর উওরসূরী হাকিম শহিদ উল্ল্যাহর গবেষণা ,সেবা,ঐতিহ্যের বৃহৎযাএা : নুরে হিদায়তের আলোয় 'রহমানিয়া মাদরাসা' চরপার্বতী ধর্মীয় জাগরনের দীপ্তাঙ্গন: 'দীন দুনিয়ার মালিক খোদা' ইসলামী গান আধ্যাত্মিকতার আলোয় এক অনন্য সৃজন যাত্রা : "সংবাদ ও সত্যের পথিক প্রবীন সাংবাদিক এমজি বাবর" খোঁজ নিতে ছুটে গেলেন নের্তৃবৃন্দ ও সহকর্মীরা : "চরপার্বতীর বুকে মৌলভীবাজার স্পোর্টিং ক্লাবের ক্রীড়া, করুণা ও স্বপ্নযাত্রার মহাকাব্য" "একান্ত সাক্ষাতকারে মাওলানা আলী আহমদ জমিরী" কোম্পানীগঞ্জ কৃষি অফিসে দুদকের অভিযান যন্ত্রপাতি ক্রয় ভর্তুকি বণ্টনে ব্যাপক অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ :

মাটি ও মানুষের আধ্যাত্মিক আলো, কাক্কু দরবেশ নীরবতার অন্তর্লোক থেকে নুরের এক অনন্ত যাত্রী:

মাটি ও মানুষের আধ্যাত্মিক আলো, কাক্কু দরবেশ  নীরবতার অন্তর্লোক থেকে নুরের এক অনন্ত যাত্রী:

মাটি ও মানুষের আধ্যাত্মিক আলো,

কাক্কু দরবেশ নীরবতার অন্তর্লোক থেকে নুরের এক অনন্ত যাত্রী:

নব জ্যোতি ফিচার ডেস্ক:

শান্ত গ্রামের বুকে আগমনের নীরব আলো :

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ৪নং আহাম্মদপুরে মতিমিয়া বাজার সংলগ্ন যে ছোট্ট গ্রামটি প্রতিদিন ভোরের আলোয় ধীরে ধীরে জেগে ওঠে,

সেই গ্রামের মাটিই বুকে ধারণ করেছিল এক এমন মানুষের জন্মস্মৃতি, যাঁর আলো পরে শুধুই গ্রাম নয় অগণিত মানুষের মনকেও আলোকিত করেছে।

সময় ছিল আনুমানিক ১৯২৪ সাল। মাটির ঘরের কাঁথা বালিশের গন্ধের মাঝে, এক সাধারণ পরিবারের ঘরে জন্ম নিলেন এমন এক শিশু যার চোখের গভীরতা থেকেই যেন ফুঁটে বেরোচ্ছিল অন্য এক জগতের নূর।

এই শিশুর নাম পরে হয়ে ওঠে,কুতুবুল আকতাব, হযরত শাহ সুফী আব্দুল গোফরান হারিছ মিয়া,আর গ্রামের মানুষ তাঁর নাম রেখেছে ভালোবাসায় কাক্কু দরবেশ।

দুই ভাই ও এক বোনের সংসারে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি শৈশব থেকেই ছিলেন এক অদৃশ্য মমতার পরশে ঘেরা।

স্থানীয় বিদ্যালয়ের পাঠ পেরিয়ে এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া। বাহ্যিকভাবে সবই সাধারণ।

কিন্তু অন্তরের গভীরে লুকিয়ে ছিল অন্য এক আকাঙ্ক্ষা আল্লাহের নৈকট্যের আকর্ষণ।

যুবক বয়সে কর্মের টানে তিনি গেলেন ভারতের কলকাতা। তখনও কেউ জানত না এই সফর কর্মজীবনের জন্য নয়; এটি ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার প্রথম সোপান।

কলকাতার ব্যস্ততা, ব্যবসা-বাণিজ্যের শহর, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের টান ছিল অন্য পথে।সেখান থেকে তিনি নিয়মিত যাতায়াত করতে লাগলেন আজমীর শরীফে,

হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.)–এর দরবারে।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তিনি সেখানে ধ্যানমগ্ন থাকতেন, রোজা রাখতেন।দরবারের বাতাসে যে সুবাস, খেদমতের যে আলো, চিশতিয়ানা যে নৈতিকতার মহিমা তা তাঁর অন্তর জগৎকে একেবারে বদলে দেয়।

সেই আজমীর শরীফেই তিনি লাভ করেন চিশতিয়া তরিকার খেলাফত।এই খেলাফত এক কাগজ বা অনুমতি নয়,এটি ছিল তাঁর অন্তর্গত জাগরণ, আলোর দ্বার উন্মোচন।

খেলাফত নিয়ে দেশে ফেরার পর মানুষ টের পেতে থাকে তাঁর ভেতরে নতুন এক দীপ্তি।

সেবারহাট মসজিদে তিনি আজান দিতেন, গভীর রাত্রি পর্যন্ত থাকতেন ইবাদতে।

মধ্যরাতে কোথায় যেতেন, কেউ জানত না। কেউ বলে উনি মারফতের সমুদ্রে ডুবে থাকতেন।

তিনি যাদের লাঠি দিয়ে ‘মহব্বত বেএাগাত’ দিতেন, তারাও আজ সফল।কারণ সেই লাঠি ছিল বেত নয় দরবেশী দয়া।

সব সময় অজু অবস্থায় থাকতেন, গলায় ঝুলত ছোট্ট একটি কোরআন শরিফ।ভাষা জানতেন আরবি, হিব্রু, উর্দু, ইংরেজি এ যেন খিজিরি জ্ঞান।

তিনি ছিলেন বাহ্যিকভাবে সাধারণ, কিন্তু ভেতরে ছিলেন এক অদৃশ্য জগতের পথিক।

গল্প নয়, কেরামতের আলো মানুষের মুখের ভাষায় ভাসমান মহাজাগতিক সত্য।

তাঁর কাছে ছিল সাতটি পুটলি।কেউ জানতে চাইলে হেসে বলতেনএ পুটলির মালিকানা তোমার চোখে দেখা যাবে না।

যারা অনুমতি ছাড়া ধরতে যেত, তারা ভয় পেয়ে যেত

কারণ পুটলি যেন সাপের মতো মনে হতো।

এ রহস্য আজও উন্মোচন হয়নি।

এক রিক্সাচালক তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দিলে দরবেশ বললেন তুই কি নিবি?লোকটি ভাবলো হয়তো সাধারণ কিছু। দরবেশ দিলেন কিছু পাতিল বাসন।

রিক্সাচালক এগুলো বিক্রি করে দেয়।কিন্তু যে ব্যক্তি এগুলো কেনেন আজ তিনি বড় পাতিল কারখানার মালিক।লোকেরা বলে সেই পাতিল ছিল দরবেশের দান,আর দানের মাঝে ছিল তাকদীরের বদল।

এক ব্যক্তি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ফিরছিল।দরবেশ তাকে ডাকলেন টাকা দে, কাল নিস।সেই রাতেই লোকটির ঘরে ডাকাতি হয়!পরদিন দরবেশ সব টাকা ফিরিয়ে দেন।এটি ছিল তাঁর কেরামতের সৌরভদৃষ্টির ভিতরকার অদেখা সত্য।

একদিন রিক্সায় উঠে বললেন,চল, ঢাকায় যাব

রিক্সাচালক অবাক।দরবেশ বললেন,চোখ বন্ধ কর।

চোখ খুলতেই তারা গুলিস্তান।কিন্তু ভক্তদের কাছে এটি কাক্কু দরবেশের বেলায়েতের খেলা।

সেবারহাট সোনালী ব্যাংকের লকার থেকে ২০ লাখ টাকা নেন।অডিট এসে দেখে এক টাকাও কম নয়!

পরদিন দরবেশ সেই অর্থ ফেরত দেন।মানুষ বলে

জাহের ও বাতেনের হিসাব তাঁর কাছে আলাদা।

ভক্তদের হৃদয়ভরা সাক্ষ্য মানুষের জীবন বদলে দেওয়া হাতো, নুরুল হোসেন এক ভক্তের আবেগ ভরা কন্ঠে বলেন , রাতে ভয় পেয়ে বাড়ি যেতে পারছিলেন না।

দরবেশ বললেন,বাইয়েনা, চিশতিয়ানা ভাই আছি তো। আমি এশিয়া মহাদেশের দায়িত্বে আছি। ভয় কেন?তার সামনে একটি কুকুর চলে আসলো ,পুরো পথ পাহারা দিয়ে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিল।

এক ব্রীকস ফিল্ড মালিক টাকার অভাবে ব্যবসা করতে পারছিলেন না।দরবেশ তাকে দিলেন একটি খালি বস্তা!হাঁটতেই তার সামনে এক ব্যক্তি এসে ৬ লাখ টাকা দিল ব্যবসার জন্য।

এখন তার ব্যবসা সমৃদ্ধ।এ কেরামত ভক্তদের ভাষায় তাসর্রুফে চিশতিয়া।

রাজনৈতিক মামলায় জর্জরিত ইসমাইল ভুইয়া দরবেশের কাছে গেলে দরবেশ বললেন তুই বিদেশ যা, আমি ব্যবস্থা করুম।তৎক্ষণাৎ তার মোবাইলে বিদেশ যাত্রার কল আসে!সেই দিনই সব বদলে যায়।

দরবারের ভেতরকার নীরব সাগর সেবারহাট থেকে করমুল্লাপুর। তিনি রিক্সায় চলাফেরা করতেন, মানুষের মতো মানুষ ছিলেন।কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো ছিল অন্য আভায় মোড়া।

ভক্ত মোহাম্মদ হোসেন যুবরাজ বলেন,শেষ সময় দরবেশ বললেন আজরাইল আসলো, সালাম দে।

তিনি প্রথমে গুরুত্ব দেননি।তৃতীয়বার বললে ভয় পেয়ে সালাম দেন।

এরপর দরবেশ বললেন,এ গোলাম কি চাস?

এ যেন বিদায়ের শেষ দয়া।পরদিন তাঁর ওফাতের সংবাদ আসে।ভক্তদের অশ্রু, মিলাদের আলো, জিকিরের গুঞ্জনে করমুল্লাপুর পরিণত হয়

এক আধ্যাত্মিক মজলিশখানা।

২০১১ সালের ১৯ নভেম্বর তাঁর ওফাত লাভ করেন।

সেই দিনই তাঁর ওরস।প্রতি বছর এ দিনে ফেনী, দাগনভূইয়া, বসুরহাট, মাইজদী, সোনাইমুড়ী, চৌমুহনী, ঢাকা থেকে ভক্তরা আসে।

মাজারে দাঁড়ালে মানুষ বলে,

এটা কবর নয় এটা নূরের নিশানা।

প্রতি বৃহস্পতিবার, শুক্রবার মিলাদ, সামা, জিকিরে এক অন্যরকম আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়।

ভক্তরা তবারুক নেয়, দোয়া করে, অশ্রুসিক্ত চোখে দরবারে দাঁড়িয়ে থাকে।

দরবেশের একমাত্র ছেলে বলেছেন,এখানে বড় একটি মাদরাসা হবে।এ যেন তাঁর আদর্শের শাশ্বত ধারাবাহিকতা।মাটি ও মানুষের দরবেশ মারফতের সমুদ্র থেকে তোলা এক মুক্তো।

কাক্কু দরবেশ ছিলেন না বড়লোক ,নন প্রভাবশালী ব্যক্তি,ছিলেন বেলায়াতের ঝান্ডাধারী।

তিনি ছিলেন মাটি ও মানুষের অন্তর-সঙ্গী।নীরবতার আলো,মারফতের বাদশাহ।

মানুষ বলেন,দরবেশের কাছে গেলে মন হালকা হয়ে যেত।কারো জীবনে বরকত আসতো,কারো দুঃখ কমত,কারো মনে শান্তি জন্মাত।

তিনি ছিলেন সেই মানুষ যার উপস্থিতি ছিল নীরব,

কিন্তু প্রভাব ছিল গভীর।যাঁর মুখে ছিল দয়ার আলো,

যাঁর চোখে ছিল সত্যের দৃঢ়তা।যাঁর কেরামত ছিল রহস্য বেলায়াতের নিদর্শন।

নোয়াখালীর মানুষ আজও তাঁর নাম নিলে সম্মানের সঙ্গে নেয়।মাজারে গেলে মানুষ বলে,দরবেশ এখনো বেঁচে আছেন নূরের মধ্যে।

কাক্কু দরবেশ শুধু একজন ব্যক্তি নয়,তিনি এক

আধ্যাত্মিক ইতিহাস।এক ভালোবাসার দিগন্ত।এক এলাকার সংস্কৃতির শিকড়।এক জীবনযাত্রার আলো।

মাটি তাঁকে ধারণ করেছে,মানুষ তাঁকে মনে রেখেছে,

আর নূর তাঁকে চিরস্থায়ী করেছে।এই নীরব মানুষটি আজও বেঁচে আছেন ভক্তদের দোয়ায়,মানুষের কাহিনীতে,আর আধ্যাত্মিকতার চিরন্তন আলোয়।

Comments (0)

Be the first to comment on this article.


Leave a comment

Your comment will be reviewed before publication.