ঢাকা    ,
সংবাদ শিরোনাম : খেলাফত মজলিস নোয়াখালীর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রুহুল আমিন চৌধুরী আর নেই খোয়াব। মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন ডেঙ্গু: মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, অবহেলার বিরুদ্ধেও যুদ্ধ সুনাগরিক গঠনে সমন্বিত সামাজিক দায়িত্ব নোয়াখালী-৫ আসনে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সংসদ সদস্যের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন মুঃ ইব্রাহিম খলিলের একগুচ্ছ কবিতা এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ ১৯ বছরের নোবেল, সন্তানের শোকে অসুস্থ বাবা কোম্পানীগঞ্জে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের চেষ্টা, চালকের গলায় ছুরিকাঘাত চরহাজারী ১নং ওয়ার্ড প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ও শিক্ষার আলোয় এগিয়ে চলা এক শান্তিপ্রিয় জনপদ কোম্পানীগঞ্জে আছিয়া কারম্যান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশ ও সিসিটিভি ক্যামেরার উদ্বোধন

সুনাগরিক গঠনে সমন্বিত সামাজিক দায়িত্ব

সুনাগরিক গঠনে সমন্বিত সামাজিক দায়িত্ব

সুনাগরিক গঠনে সমন্বিত সামাজিক দায়িত্ব

মোহাম্মদ উল্যা মিরাজ

শিক্ষক,সাংবাদিক ও গবেষক

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে মাপা যায় না। রাষ্ট্র কতটা সভ্য, মানবিক ও টেকসই;তার বড় পরিচয় নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের চরিত্র, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, আইনমান্যতা ও মানবিক আচরণের ওপর। আর সুনাগরিক হঠাৎ তৈরি হয় না; পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, রাষ্ট্র ও পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্মিলিত প্রভাবেই একজন মানুষের মূল্যবোধ ও চরিত্র গড়ে ওঠে।

সুনাগরিকের প্রথম বিদ্যালয় পরিবার। শিশুর নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি তৈরি হয় ঘরে। বাবা-মায়ের কথাবার্তা, পারস্পরিক সম্মান, সত্যবাদিতা, অন্যের অধিকারকে মূল্য দেওয়া, দুর্নীতি ও অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করা;এসব শিশুর মনে গভীর ছাপ ফেলে। সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল বা অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে ভালো মানুষ, দায়িত্বশীল ও বিবেকবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই অভিভাবকের বড় দায়িত্ব।

এরপর আসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার উপায় নয়; শিক্ষা মানুষকে যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক, মানবিক ও দায়িত্বশীল করে তোলার মাধ্যম। শিক্ষক যদি সততা, ন্যায়, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার জীবন্ত উদাহরণ হন, তবে তাঁর আচরণ শিক্ষার্থীর ওপর বইয়ের শিক্ষার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, নাগরিক দায়িত্ব, সমালোচনামূলক চিন্তা, সামাজিক সহমর্মিতা ও বাস্তব জীবনভিত্তিক শিক্ষা জোরদার করা জরুরি।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতৃত্বের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব ধর্মের মৌলিক নৈতিক শিক্ষা মানুষকে সত্য, ন্যায়, সংযম, দয়া, পরোপকার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। ধর্মীয় নেতাদের বক্তব্য হওয়া উচিত বিভাজন বা বিদ্বেষ নয়;মানবিকতা, শান্তি, ন্যায় ও নৈতিকতার পক্ষে। ধর্মীয় অনুশাসন তখনই সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যখন তা ব্যক্তির আচরণ ও চরিত্রে প্রতিফলিত হবে।

একজন মানুষের চরিত্র গঠনে পরিবেশ ও প্রতিবেশীর প্রভাবও কম নয়। যে সমাজে মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও অসভ্য আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়, সেখানে তরুণ প্রজন্মের নৈতিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বিপরীতে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, সহনশীল ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ পরিবেশ মানুষকে ইতিবাচক আচরণে উৎসাহিত করে। তাই সন্তানকে শুধু উপদেশ দিলেই হবে না; তাকে যে সামাজিক পরিবেশে বড় করা হচ্ছে, সেটিও নিরাপদ ও নৈতিক করতে হবে।

রাজনৈতিক নেতা ও সমাজপতিদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ শুধু বক্তৃতা শোনে না, নেতৃত্বের আচরণও অনুসরণ করে। নেতারা যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দুর্নীতিবিরোধী, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী হন, তাহলে সমাজে ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়। বিপরীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যাচার, পেশিশক্তি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে তরুণদের কাছে ভুল বার্তা যায়—অন্যায় করেও সফল হওয়া যায়।

একইভাবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী ও সমাজের প্রবীণদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে আমরা যা বলি তার চেয়ে অনেক সময় সে যা দেখে, সেটিই বেশি শেখে। ফলে সুন্দর ব্যবহার, শিষ্টাচার, সহনশীলতা, মতভিন্নতার প্রতি সম্মান এবং দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মিতা;এসব সামাজিকভাবে চর্চা করতে হবে।

তবে এসব প্রচেষ্টার সর্বোচ্চ রক্ষাকবচ হলো সুশাসন ও ইনসাফ। রাষ্ট্রে যদি আইনের প্রয়োগে বৈষম্য থাকে, অপরাধী প্রভাবশালী হলে ছাড় পায় এবং দুর্বল মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে নাগরিকের মধ্যে আইন ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়। ন্যায়বিচার কেবল আদালতের বিষয় নয়; প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই ন্যায় ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সুনাগরিক গঠনের জন্য তাই প্রয়োজন পরিবারের আদর্শ, শিক্ষকের শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসনের নৈতিকতা, সমাজের ইতিবাচক সংস্কৃতি, প্রতিবেশীর সহযোগিতা, নেতৃত্বের সততা এবং রাষ্ট্রের সুশাসনের সমন্বয়। কোনো একটি প্রতিষ্ঠান একা এই দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।

আমাদের মনে রাখতে হবে,একটি শিশুকে ভালো মানুষ বানানো মানে শুধু একটি পরিবারকে ভালো করা নয়; বরং ভবিষ্যৎ সমাজ ও রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা। আজ যে শিশু সত্য কথা বলতে শেখে, অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে শেখে, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে শেখে এবং নিজের দায়িত্ব পালন করতে শেখে;আগামী দিনে সেই-ই হবে সৎ শিক্ষক, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, ন্যায়পরায়ণ নেতা, বিবেকবান সাংবাদিক, আদর্শ অভিভাবক ও সুনাগরিক।

অতএব, সুনাগরিক গঠনের দায়িত্ব কারও একার নয়—এটি আমাদের সবার। পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে যদি কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য, ন্যায়, সততা, সুন্দর ব্যবহার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবেই গড়ে উঠবে এমন একটি প্রজন্ম, যারা শুধু নিজের অধিকার জানবে না—অন্যের অধিকারও রক্ষা করবে; শুধু রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুবিধা চাইবে না;রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিও নিজের দায়িত্ব পালন করবে।

কারণ উন্নত রাষ্ট্রের ভিত্তি উন্নত অবকাঠামো নয়, উন্নত মানুষ। আর উন্নত মানুষ তৈরির কারখানা হলো; পরিবার, শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও সুশাসনের সম্মিলিত ব্যবস্থা।

Comments (0)

Be the first to comment on this article.


Leave a comment

Your comment will be reviewed before publication.