'হেমন্তের সোনালী সকালে মেধার উৎসব উদয় এইড ফাউন্ডেশনের বৃত্তিতে আলোকিত কোম্পানীগঞ্জ '
বসুরহাট পৌরসভা মিলনায়তনে ৪৫০ শিক্ষার্থীর মাঝে বৃত্তি বিতরণ,স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও প্রত্যয়ের এক অনন্য মিলনমেলা:
মোঃ আল এমরান
হেমন্তের স্নিগ্ধ, সোনালী শীতের সকালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভা যেন পরিণত হয়েছিল এক আলোকোজ্জ্বল জনপদে। ১৩ ডিসেম্বর, শনিবার বসুরহাট পৌরসভার মিলনায়তন ঘিরে ছিল
ব্যতিক্রমধর্মী এক উচ্ছ্বাস, এক আবেগঘন প্রত্যাশা।
শত শত শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, গুণীজন ও আমন্ত্রিত অতিথিদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে বসুরহাটের সকাল। মনে হচ্ছিল, এ যেন কেবল একটি বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান নয়,এ এক মেধার উৎসব, স্বপ্নের মেলা, ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতিজ্ঞা।
কচি-কিশোর শিক্ষার্থীদের চোখে ছিল আনন্দের ঝিলিক, কারও চোখে স্বপ্নের জল, কারও মুখে বিজয়ের হাসি। মিলনায়তনের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা
সাজসজ্জা, প্রবেশমুখের নান্দনিক তোরণ, দেয়ালে টাঙানো ছোট ছোট পেস্টুনে লেখা মহামূল্যবানী। সব মিলিয়ে এক অনন্য পরিবেশের সৃষ্টি করে। যেন প্রতিটি বাক্য শিক্ষার্থীদের মনে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল,সাহস যোগাচ্ছিল সামনে এগিয়ে যাওয়ার।
পেস্টুনে লেখা বাণীগুলো যেন ছিল পথচলার দিশারি,
“আজ যে আলোয় তোমরা জ্বেলেছো, তা ভবিষ্যতের অন্ধকার ভাঙবে"।“মেধার আলোয় উদিত হোক তোমার ভবিষ্যৎ"।“ভাগ্যের দিকে চেয়ে বসে থাকা, কাপুরুষের কাজ,পরিশ্রমের মাধ্যমে ভাগ্য বদলানো সাহসীদের চিহ্ন"।এসব বাণী শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল বারবার।
অনুষ্ঠানের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রাসুল (সা.)-এর বাণী,“Take advantage of five before five”অর্থাৎ,১.বার্ধক্যের আগে যৌবনকে।
২.অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে। ৩.দারিদ্র্যের আগে
সচ্ছলতাকে।৪.ব্যস্ততার আগে অবসরকে।
৫.মৃত্যুর আগে জীবনকে গনীমত মনে করো।
এই বাণী যেন শিক্ষার্থীদের জীবনের দর্শন হয়ে ধরা দেয়।সময়কে কাজে লাগানোর, সুযোগকে আঁকড়ে ধরার এক মহান শিক্ষা।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। কবিরহাট মডেল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সালেম ইবনে গুলজারের কণ্ঠে তেলাওয়াত উপস্থিত সবার হৃদয়ে এনে দেয় এক পবিত্র প্রশান্তি। এরপর শুরু হয় দিনের মূল আয়োজন,উদয় এইড ফাউন্ডেশনের বৃত্তি প্রদান ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন,নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সায়মা আহম্মেদ চৌধুরী ও শামসু উদ্দিন চৌধুরী। নোয়াখালী মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী মিস জহিন ও ফেনী স্কুল এন্ড কলেজের ছাএ খালেদ সাইফুল্লাহ মাসুম।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কাজী নুরুন্নাহার, যুগ্ম সচিব (প্রশাসন), প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তিনি তার বক্তব্যে বলেন,
সমাজে যদি ধনী ও সচ্ছল শ্রেণির মানুষ এগিয়ে আসে,
তবে পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরাও এগিয়ে যাবে। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মেধার বিকাশ, সহযোগিতা ও শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত হলে এই শিক্ষার্থীরাই একদিন দেশ গড়ার কারিগর হবে।
তার বক্তব্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে আশার আলো জ্বেলে দেয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও উদয় এইড ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মামুনুর রশিদ। তিনি বলেন, আমি শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে চাই। এই কারণেই বৃত্তি কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। আমরা আশানুরূপ সাড়া পেয়েছি এবং ২০২৫ সালের বৃত্তির ফলাফল সময়মতো দিতে পেরেছি। মহান আল্লাহ পাকের নিকট শুকরিয়া।
তিনি আরও বলেন, এই বৃত্তি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে, পড়াশোনায় মনোযোগী করবে। ভবিষ্যতে স্পোর্টিং ক্লাব, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ কার্যক্রমসহ নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন
আমিরুল হায়দার চৌধুরী, অতিরিক্ত জেলা জজ (কক্সবাজার)মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কোম্পানীগঞ্জ,নোয়াখালী।
বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন রুবাইয়া বিনতে কাশেম, সহকারী কমিশনার (ভূমি), কোম্পানীগঞ্জ,নোয়াখালী ।
এছাড়াও বক্তব্য দেন,প্রফেসর আব্দুল মান্নান (বাংলাদেশ শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা) প্রফেসর হাফেজ মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান (অধ্যক্ষ, কবিরহাট সরকারি কলেজ)তাঁরা সবাই শিক্ষার মানোন্নয়ন, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও হাজারীহাট বিএম স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল,শেখ সাদী ভুঁইয়া।একজন গনমাধ্যমকর্মীর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন,এই বৃত্তি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জন্য একটি মাইলফলক। এর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি।
এছাড়াও আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন,মাসিক নব জ্যোতি পএিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ও বাংলাদেশ শিক্ষা পর্যবেক্ষক সোসাইটি নোয়াখালী জেলার কো-অর্ডিনেটর মোঃ আল এমরান।
মোঃ হারুন অর রশীদ, সিনিয়র সহ সেক্রেটারী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা শিক্ষক সমিতির ও সিনিয়র শিক্ষক, কোম্পানীগঞ্জ মডেল হাই স্কুল।
মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, সাংগঠনিক সম্পাদক, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা শিক্ষক সমিতি ও সহকারী শিক্ষক, রংমালা আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয়।
ফরিদ উদ্দিন রাশেদ, সভাপতি, মাধ্যমিক শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি লিমিটেড।
সহকারী শিক্ষক কোম্পানীগঞ্জ মডেল হাই স্কুল।
তাঁরা মিডিয়া কর্মীদের একান্ত সাক্ষাতে তাদের কণ্ঠে উঠে আসে,মেধাবীরাই জাতির ভবিষ্যৎ, আর এই বৃত্তি তাদের জন্য এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা।
এ বছর ৭ নভেম্বর উদয় এইড ফাউন্ডেশনের বৃত্তি পরীক্ষায় নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, ফেনীর দাগনভূইয় উপজেলার ১১৩ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী অংশ গ্রহন করে । এর মধ্যে ১৩ জন ট্যালেন্টপুল বৃত্তি,৪৫০ জন সাধারণ বৃত্তি লাভ করে।
ট্যালেন্টপুল বৃত্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে একজনকে “ট্যালেন্ট অব দ্য ইয়ার” হিসেবে একটি ল্যাপটপ প্রদান করা হয়। বাকি ১২ জনকে দেওয়া হয় ৫ হাজার টাকা করে। সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থী পায় ২ হাজার টাকা ও সনদপত্র।
শিক্ষার্থীদের হাতে ক্রেস্ট দেওয়ার মুহূর্তে মিলনায়তনে নেমে আসে এক আবেগঘন নীরবতা, তারপরই করতালির গর্জন।এক অভিভাবক চৌধুরিহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উওম কুমার বলেন,এই বৃত্তি কার্যক্রম কোম্পানীগঞ্জে একটি বৃহৎ আয়োজন। এটি আমাদের ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনায় নতুন করে অনুপ্রেরণা দেবে।
অনুষ্ঠানের শেষপ্রান্তে এসে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি সত্য উদয় এইড ফাউন্ডেশন কেবল বৃত্তি দিচ্ছে না, তারা আলো জ্বালাচ্ছে। যে আলো দিয়ে আলোকিত হবে আগামী দিনের কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী, বাংলাদেশ।
উল্লেখ্য, উদয় এইড ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে মেধাবী ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে আয়োজকরা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
হেমন্তের সেই সোনালী সকালে বসুরহাট পৌরসভার মিলনায়তনে যে আলো জ্বলে উঠেছিল, তা নিভে যাওয়ার নয়। সেই আলো ছড়িয়ে পড়বে শিক্ষার্থীদের মেধা, মনন ও মানবিকতায়।এই আয়োজন স্মৃতি হয়ে থাকবে,একটি দিন, একটি আলো, একটি উদয়ের গল্প।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment