'ইলমের আলোয় সমাজ জাগরণের এক তাফসীরুল মাহফিল অনুষ্ঠিত'
মৌলভীবাজার ওবায়দিয়া ইসলামীয়া মাদরাসার উদ্যোগে ৩৩তম ঐতিহাসিক তাফসীরুল কোরআন মাহফিল দ্বীনি শিক্ষা, মানবিকতা ও ঐক্যের অনন্য দৃষ্টান্ত:
নব জ্যোতি রিপোর্ট ডেস্ক:
“আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন, আর তিনি যাকে হিদায়াত দেন, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন।”(সুরা আল-আন‘আম: ১২৫)
ইলম, তাকওয়া ও তাফসীরের আলোয় উদ্ভাসিত এক ঐতিহাসিক দিন প্রত্যক্ষ করলো নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চারপার্বতী ইউনিয়নের মৌলভীবাজার এলাকা।
মৌলভীবাজার ওবায়দিয়া ইসলামীয়া মাদরাসা ও এলাকাবাসীর যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো ৩৩তম ঐতিহাসিক তাফসীরুল কোরআন মাহফিল যা দ্বীনি শিক্ষা, সামাজিক সংহতি ও মানবিক দায়িত্ববোধের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
গত ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ইং, শুক্রবার, বিকাল ৩ ঘটিকা থেকে মৌলভীবাজার ওবায়দিয়া ইসলামীয়া মাদরাসা ময়দানে শুরু হয় এই মাহফিল।কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সূচিত এই আয়োজন ক্রমে পরিণত হয় ঈমানী জাগরণের এক মহামিলনে।
দূর-দূরান্ত থেকে আগত ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উপস্থিতিতে মাদরাসা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকা পরিণত হয় এক পবিত্র দ্বীনি সমাবেশে। মাহফিলে নারীদের জন্য পৃথক প্যান্ডেলের সুব্যবস্থা রাখা হয়,
যা আয়োজনের শৃঙ্খলা ও পর্দার গুরুত্বের বাস্তব প্রতিফলন। “তোমাদের মধ্যে তারাই উত্তম, যারা কোরআন শিখে এবং কোরআন শিক্ষা দেয়।”
(সহিহ বুখারি) দ্বীনি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
মাহফিলের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন
হাজ্বী আব্দুল মুকিদ সাহেব, কোষাধ্যক্ষ,
মৌলভীবাজার জামে মসজিদ।
আসরের নামাজের পর শুরু হওয়া এ অধিবেশনে একে একে বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন উলামায়ে কেরাম। তাঁদের বয়ানে উঠে আসে কোরআনের আলোকে সমাজ সংস্কার, চরিত্র গঠন ও দ্বীনি শিক্ষার অপরিহার্যতা।
মাগরিবের পর ওয়াজ করেন, মাওলানা জামাল উদ্দিন জাফরী, নোয়াখালী।তিনি কোরআনের তাফসীরের মাধ্যমে বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ ও উত্তরণের পথ তুলে ধরেন।
এশার নামাজের পর শুরু হয় দ্বিতীয় অধিবেশন, যার সভাপতিত্ব করেন হাজ্বী মোঃ মাহবুবুল হক,
সাবেক সভাপতি, মৌলভীবাজার জামে মসজিদ।
এশার পর বিশেষ মুফাসসির হিসেবে ওয়াজ করেন
মাওলানা আব্দুল হালিম জিহাদী, সাবেক শিক্ষা পরিচালক, হোসাইনিয়া মাদরাসা, ফেনী। তিনি কোরআনের আলোকে ইলম ও আমলের সম্পর্ক, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন।
রাত ৯টা ৩০ মিনিটের পর মাহফিলের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে ওয়াজ করেন,প্রধান মুফাসসির, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ
মাওলানা মুফতি মামুন হোসাইন হাবিবী,
প্রিন্সিপাল, উম্মুল ক্বোরা মডেল মাদরাসা, ঢাকা।
তাঁর হৃদয়স্পর্শী তাফসীর ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা উপস্থিত মুসল্লিদের চোখে পানি এনে দেয়। তিনি কোরআনকে জীবনের সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান।“এই কোরআন মানুষকে সঠিক পথ দেখায় এবং সৎকর্মশীল মুমিনদের সুসংবাদ দেয়।”
(সুরা বনী ইসরাঈল: ৯) মাহফিলের শুরুতে পবিত্র আল-কোরআনের সুললিত তিলাওয়াত পরিবেশন করা হয়। পুরো অনুষ্ঠান সুশৃঙ্খলভাবে সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট হামদ ও নাত শিল্পী এইচ. এম. এফ. হায়দার।
আসরের নামাজের পর এক হৃদয়গ্রাহী আয়োজনের মাধ্যমে মাদরাসার নার্সারি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১-৮ পর্যন্ত রোল নাম্বারের ৪৮ জন কৃতি ছাত্র-ছাত্রীকে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়। প্রবাসী হতে এই অনুদান প্রদান করা হয়। মৌলভীবাজার স্পোর্টিং ক্লাব-এর পক্ষ থেকে আলমগীর শিমুল, আবু সুফিয়ান, আবু ছায়েদ (যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী) অনুদান দেন ।পুরো কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করেন ক্লাবের প্রধান উপদেষ্টা কবি আবুল হোসেন সিরাজী এবং সমন্বয়ক হৃদয়।
এছাড়া ৩০ জন শিক্ষার্থীকে কোরআন শরিফ হাদিয়া প্রদান করা হয় সৌদি আরব প্রবাসী জাকের উল্লাহর সহধর্মিণীর পক্ষ থেকে। “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করবেন।” (সহিহ মুসলিম)।
প্রধান বক্তার ওয়াজের পূর্বে মাদরাসার বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব পেশ করেন মাদরাসার কোষাধ্যক্ষ ও মাসিক নব জ্যোতি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক
মোঃ আল এমরান।এই স্বচ্ছতা উপস্থিত মুসল্লিদের আস্থা আরও সুদৃঢ় করে।
মাহফিল বাস্তবায়নে ১৫ দিনব্যাপী সমাজ থেকে অর্থ সংগ্রহ,বিভিন্ন বাজার কালেকশনসহ অক্লান্ত পরিশ্রম করেন,
সাইফুল ইসলাম, হৃদয়, শাহীনসহ মৌলভীবাজারের যুব সমাজ। বিশেষ অবদান রাখেন,সমাজসেবক মোঃ কাজেম উদ্দিন,ব্যবসায়ী জাকির হোসেন, মাদরাসার মুহতামিম মোঃ আব্দুল্লাহ,সহকারী শিক্ষক মনির।
প্রবাসী দাতা সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রহমত উল্লাহ রাজু (সৌদি আরব),সাব উদ্দিন (যুক্তরাষ্ট্র),আবু তোয়াহ (যুক্তরাষ্ট)সহ আরও অনেক প্রবাসী অনুদান দেন।গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন,২নং চরপার্বতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজী হানিফ আনসারী,৭নং ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুল্লাহ আল মামুন,শিহাব উদ্দিন, পল্লী চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম,ব্যবসায়ী আব্দুল মোতালেব, শিক্ষক বোরহান উদ্দিন,সমাজসেবক আনোয়ার হোসেন ও আনোয়ার হোসেন বাবু,ব্যবসায়ী ফিরোজ আলমসহ আরও অনেকে।
বক্তারা ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব, পর্দা, দ্বীন অনুযায়ী জীবন গঠনের আহ্বান জানান। মাহফিলের শেষাংশে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পাশাপাশি শহীদ শরিফ ওসমান হাদী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া করা হয়। সভাপতি মোঃ মাহবুবুল হক ওয়াজ ও মোনাজাতের মাধ্যমে মাহফিলের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
উল্লেখ্য, ওবায়দিয়া ইসলামীয়া মাদরাসা ১৯৯২ সালে মরহুম এজহারুল হক কর্তৃক তাঁর সহোদর মরহুম ওবায়দুল হক-এর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০০২ সালে মৌলভীবাজারের ধর্মপ্রাণ মানুষের উদ্যোগে মাদরাসাটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে আজ অবধি এই প্রতিষ্ঠান দ্বীনের খেদমতে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
৩৩তম তাফসীরুল কোরআন মাহফিল প্রমাণ করে, ইলম, ঐক্য ও মানবিকতার সমন্বয় হলে একটি সমাজ আলোকিত হতে বাধ্য। মৌলভীবাজার ওবায়দিয়া ইসলামীয়া মাদরাসার এই আয়োজন শুধু একটি মাহফিল নয়, এটি একটি দ্বীনি আন্দোলন, একটি প্রজন্ম গঠনের নীরব বিপ্লব।“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (সুরা আর-রাদ: ১১)
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment