কবিতা গুচ্ছ
১.
হেমন্তের হইচই ।
মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন ।
হেমন্তের পিঠে চড়ে শীতের খণ্ডগুলো
ঘেমে ঘেমে প্রবেশ হতে চলেছে -
গাঁয়ের আঁচল ঘেঁষে ইটপাথরের কার্নিশে ।
পৌষের গা ছিটিয়ে মাঘের কোল ঘেঁষে
তবেই নেবে অবকাশ ।
জলের শান্ত ধারায় উচ্ছ্বাসে ঝরে পরা শুকনো পাতা
বসবে আয়েস করে
হিমহিম বাতাস ঢেউ ধুলিয়ে নিয়ে যাবে জলের কিনার
পথের নাচোড় ধূলিকণা বাতাসের মিছিলে
করবে রাজত্ব মহাসড়কে বুকে ।
জমিনের সবুজ বুক হলদে মাখা বিকেলের দেয়ালে
এঁকে দেবে ফসলের সুখ
কনকনে শীতে ভোরের সুরুজ আলস্যে দেবে হামাগুড়ি কুয়াশার চাদর জড়িয়ে ।
নাস্তার পাটিতে বসবে মেলা পিঠাপুলির উৎসব ।
খোয়াড়ের পাখিরা ডানা গুঁজে নেবে খানিক বিশ্রাম
এখনো সকাল হয়নি ভেবে
কিষাণের সস্তির ভাঁজে শোভা পায় চিরায়ত হাসি
রাতের শরীরে শীতের রাজত্ব ছুঁয়ে যায় ঘুমের আড়তে
তবু প্রভাতে শোরগোলে বেজে উঠে হেমন্তের হইচই ।
২.
ভোরের ঝলসানো চোখ ।
মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন ।
ভোরের ঝলসানো চোখের চাহনিতে
আঁধার নেয় বিদায় স্ববান্ধবে
ভোর সাজায় তার একান্ত সঙ্গী দিনের সুরত
মেখে দেয় আলোর দেয়ালিকা ।
নগরে নগরে গাঁয়ের আঁচলে বেজে উঠে সাইরেন
ব্যস্তময় কোলাহলের নয়া ডাক
বিছিয়ে দেয়া সড়কের খসে যাওয়া ধুলি-কণা
দেয় তার সাক্ষ্য।
শিশিরের দৃষ্টি মুছে দেয় পাতার দুসর রং
নড়েচড়ে জেগে উঠে পত্র পল্লব।
দানিউব নদীর উর্ভরী স্রোত ঢেলে দেয় আরও কিছু দেশ-মানচিত্রের সীমান্ত ঘেঁষে খরার চোখ ভিজিয়ে
যেখানে দৈত্যাকার সুড়ঙ্গ চুষে নেয় জলের আমানত।
মহাকাল বিছিয়ে দেয় নয়া পাটি ভোরের ডাকে
আগামীর বন্দোবস্তে-
কেউ কেউ নেমে পড়ে কলস্বরে কল্যাণের আহবানে
কেউ কেউ কুড়িয়ে নেয় অভিশাপ অকল্যাণে দিনমান খেটে।
৩.
মন্ত্রবীজ ।
মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন ।
একটি মন্ত্র শিখিয়ে দাও -
ভালো থাকার
অথবা ভালো রাখার ।
আমিতো ভোরের রাখাল-
দিনমান খেটে চাষ করি
যত্নে রাখার মন্ত্রবীজ ।
অবলা মেঘের আনাগোনা থামিয়ে দেয়
সোনালি বীজের পুষ্পিত পরাগচোখ ।
রাতের শরীরে খানিক বিশ্রামের সুরতে
ঢলে পড়া দেহে বিভক্তির রেখা
নিয়ে যায় কপাল ভাঁজে
সেই রগচটা চোখ - তার নিত্য রোগ ।
সম্পর্কের দেয়ালে দৃশ্যমান সরল রেখা
প্রাচীন সেই উল্লম্ব সীমানার যতি -
যা দূর হতে অতি সরলাকার
আসলেই দীর্ঘ এক অবিশ্বাস্য অসম বক্রাকার ।
৪.
ভালোবাসা তুমি কি?
মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন ।
ভালোবাসাকে তুমি কি কিশোর, যুবক
নাকি বয়সের ভারে নুয়ে পড়া সেই বৃদ্ধার চোখ
নাকি প্রভাতের আঁচল খোলা গোলাপার ঠোঁট🌹
ভালোবাসা তুমি কি নর নাকি নারী
নাকি উভয়ের অন্তরাত্মার এক মিলন কুমারী!
ভালোবাসা তুমি কি কোমল
নাকি ইস্পাতের মত কঠিন লোহ দন্ড
নাকি পাহাড়ের মত দাড়িয়ে থাকা এক পাথর খণ্ড ।
ভালোবাসা তুমি কি নারীর লাজ !
অথবা তার প্রত্যহ সাজ !
নাকি পুরুষের শিনায় ভাঁজ করা রগচটা মেজাজ?
ভালোবাসা তুমি কি মায়ের আলতো আদর ?
কোমল ডাকে তুলে নেয়া মায়ের মায়ার চুম
নাকি বাবার হাঁকডাক আর দারাজ গলার ধুম?
ভালোবাসা তুমি কি রোদলা দুপুরে -
খোকার অভিমানী মুখ ?
নাকি খুকুর মিষ্টি স্বরে বকে যাওয়া গল্পের সুখ?
ভালোবাসা তুমি কি কৈশোরের ছুটে চলা
বন্ধুদের আড্ডায় বলা পুতি
নাকি একাকিত্বের বার্ধক্যর পড়ে থাকা বৃদ্ধের সারথী ?
ভালোবাসা তুমি কি শিউলি বকুল গোলাপ রানী
শাপলা পদ্ম জবা নাকি সকল ফুলের ফুলদানি ?
ভালোবাসা তুমি কি স্ত্রীর অভিমানি মুখ
নাকি স্বামীর রাগের দুখ
নাকি দুজনার মিলনমেলার দূত ?
ভালোবাসা তুমি কি পবিত্র প্রেমের প্রত্যাখ্যান
নাকি দুজনার অনন্ত মিলনের উপাখ্যান ?
ভালোবাসা তুমি কি প্রেমের অপূর্ব রোমান্স ,
কষ্টের হিমালয় ?
নাকি প্রেমিকার ধোকার ভয় ?
ভালোবাসা তুমি কি স্বর্গের হুর
নাকি নরকের দুপুর?
ভালোবাসা তুমি কি বাসরের আদর
নাকি রাতের একাকিত্বের ব্যথিত চাদর?
৫.
নায়াগ্রার জলনূপুর ।
মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন ।
নায়াগ্রার জলনূপুর রোজ দর্শন কর উচ্ছ্বাসে
বুকের আঁচল সরিয়ে দাও আবেগের সর্বস্ব।
কামনাতীর্থ অন্তরাত্মা ঢেলে দাও ভোগের আমেজ ।
অথচ, দেখোনা এই চোখের সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া
সেই নায়াগ্রার যে জল ঝরে পড়ে, তা -
আমার নিঃশব্দে কান্নার নিনাদ স্রোত ।
প্রাতঃস্নান শেষে তৃপ্ত অনুভবে যখন বারান্দায়
চৈতলী হাওয়ায় দাড়িয়ে থাক
খানিক ভাবনার উদয় হয়না-
আলুথালু এ দেহের নির্ঘুম পড়ে থাকা
নিঃসঙ্গতার আহাজারি ।
হাজারো কোলাহলের চৈতন্যে কতটা একা !
একাকিত্ব এসে ভর করে রাতের চাদর সরিয়ে
লেপটে দেয় অন্তরাত্মায় বিষাদের ক্ষতচিহ্ন
কুচিয়ে কুচিয়ে বিষাধক্ষরণ ঘটে প্রতিটি নিঃসাসের ফটক খুলে, এই একাকিত্বের শকট বয়ে যায় বিরতিহীন।
বিষাধের খানাখন্দ উল্টে দেয় বারবার
এই মহাকালের সুডঙ্গে কেউ কি আছে?
কেউ কি আছে - তবে শোনা যাক নির্মল আওয়াজ !
এক ফোঁটা প্রীতি ধার দিতে পার ?
পার কি চলাভিনয়ে তুলে নিতে এই দেহখানা- আঁচল ছায়ায়?
সময়ের রেখা গুলো ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হতে চলেছে
জীবনের হাঁকডাক আর যায় না শোনা
মাটির গন্ধ এসে ডাক দেয়- মাটির সহবাসে ।
আছে কি কেউ-?
প্রকাণ্ড পৃথিবীর অস্তিত্বের আনাচকানাচ, দেয়াল জুড়ে?
কেউ কি আছে খানিক জড়িয়ে আলতো আবেশে
কোমল হাতের পরশ মেখে আস্থার আভিজাত্য
আর স্বর্গীয় ভালোবাসার গম্বুজ এঁকে
নিখাদ নাদ শুনিয়ে নিশ্চিন্ত করবে
চিরন্তন পাশে থাকার চূড়ান্ত বন্দোবস্ত? ।
৬.
যৌবনা জীবনের আদ্যপান্ত
মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন ।
তোমার চোখের সড়কে আমি দেখতে পাই
সুরু সুড়ঙ্গ আর কাঁটাবাহার- খানাখন্দ ।
অথচ মোনালিসার রূপের মুখোশ পরে
শঠতার মায়াবী জালে হরিণি চোখের ইশারায়
আমায় নিয়ে যেতে চাও কোন দূর সীমানায় ।
এই দুঃখ গাঁথা জীবনের মোড়কে আসেনি কেউ
খানিক পরশ বুলাতে, অথবা ভাবের অভিনব ছল
করেনি কোন কান্তার চোখ ।
কি খরায় কেটে গেল যৌবনা জীবনের আদ্যপান্ত
কারো মনের ঘরে কখনো ফিসফাস হয়নি,
রটেনি গুঞ্জন আদতে মজার ছলে ।
চোখের সীমানা যেখানে ক্লান্ত হয়,
ললনাদের শরীরী ঢং ততই নিখাদ এসে
সারিবদ্ধ এক দেয়াল তৈরি করে দেয় ।
তবু, এই একাকিত্ব মনের সরোবরে উপচে পড়া বিবাগী মনের ডাক শোনেনি কোন প্রেম প্রেয়সী ।
৭.
হ্যালুসিনেশন।
মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন ।
সহস্র নটিকাল মাইল উপর হতে
মহাসড়ক গুলোকে দেখা যায় যেন গাছের বাকল
তার উপর হেটে চলছে পিপিলিকার দল ।
কিন্তু কিসের এতো বিসংবাদ, ভাঙনের শব্দ !
নাতিদুর যেতে না যেতে দেখি বেঁধে আছে ঝটলা,
শৃঙ্খলহীন শোরগোল ।
পিপিলিকার পথ চলা তো হয় মসৃণ ও
বিরামহীন লক্ষ্য পানে ছুটে চলা ।
দলে বলে কৌশলে শিরোধার্য নির্দেশনা মেনে
চলতে থাকে গন্তব্যের মসনদে,
সম্প্রীতির সড়ক নির্মাণ করে
সময়ের চোখে চোখ রেখে
তুলে আনে সহস্র দিবসের আগাম বন্দোবস্ত।
অন্তরীক্ষের মেঘপুঞ্জ খণ্ডিত করে
বাতাসের সড়কে আলোর বেগে ছুটে চলা
মহাপতঙ্গের অবতরণ,
দুচোখের হ্যালুসিনেশন কেটে যায় সহসা ।
কিছু সময় অবসরে থাকা মস্তিষ্কের নিউরোন বার্তা দেয়, আপনি আবার নিজেকে সমর্পণ করেছেন সেই মানবদেয়ালের বিসংবাদের নিত্য কোলাহলের বিড়ম্বনায় ।
৮.
পেন্ডুলাম পাখি ।
মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন ।
একটি পেন্ডুলাম পাখি কতটা তটস্থ হলে
দীক্ষা নেয় উচ্চবর্গীয় স্থাপত্য বিদ্যার উন্নত জ্ঞান !
উড়ো সঙ্গিনী আর প্রজন্মের আগমন
সুদৃঢ় করতে সুকৌশলে নির্মাণ করে
তরুর ঢালে পাতায় পাতায় জীবন বাঁচার আলপনা ।
কি নিখুঁত নির্মাণে নিশ্চিত করে নিরাপদ আশ্রম,
তবু কি স্বর্পরাজের আক্রমণের আঘাত এড়িয়ে যেতে পারে?
পেন্ডুলাম তা জেনেই তার স্থাপত্য নকশা
সেই আদলেই সম্পাদন করে নিখুঁত কারুকার্য।
মহাকালের এই মুখোশের খোলসে সহস্র পেন্ডুলাম
বাস করে ভয়ে আতঙ্কে,
কান ফাটা মিসাইল শব্দের নগরে।
যুগে যুগে পেন্ডুলাম স্বগোত্রে আড়ালে গড়ে তোলে
শুভঙ্করী আশ্রমের ফটক
সভ্যতার শেকড়ে প্রবল ক্ষুধার্ত প্রাণখেকো থাকে ওতপেতে ।
৯.
পাথরচাপা
মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন ।
স্বদেশের প্রাণ আজ পাথরচাপায় মর্দন করা
পড়ে আছে বোবাকান্নায় লাজুক আঁচলভাজে
২৪ শে জন্ম নেয়া শিশুটি আজ বাকরুদ্ধ !
অথচ; মোড়ে মোড়ে কত আলোকসজ্জা
অভ্যর্থনার ল্যাম্পপোস্ট, মানচিত্রের উচ্ছ্বাস
বিজয়ের গ্রাফিতি- সব কি আজ ম্লান ?
এই যে এতো প্রাণ ইতিহাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়
যারা, প্রাগৈতিহাসিক নিয়মে বুলেট আলিঙ্গন করে
এই সবুজ শ্যামলিমার উদরে দিয়ে গেল বিশ্বাস আর অধিকারের মানচিত্র-
তারাও কি আজ পাথরচাপায় প্রাণরুদ্ধ?
পাথরচাপায় সমাধি হোক হন্তারক গোষ্ঠী।
প্রতিদিন জ্বলে উঠে সহস্র তারকা
আজও-
আগামীর তারকারা জেগে উঠুক, জ্বলে উঠুক মহা তারকার সমাবেশে, জন্ম হোক এক নতুন ভোর-নবাগত প্রজন্মের প্রহরায় ।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment