ঢাকা    ,
সংবাদ শিরোনাম : আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মানুষ ও সৃষ্টির মননে উচ্ছ্বাস বোনা এক আরাধ্য ঋতুর নাম ঋতুরাজ শরৎ সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিনকে ঘিরে চরপার্বতীতে জমে উঠছে নির্বাচনী সমীকরণ: "কোম্পানীগঞ্জের সম্ভাবনার আড়ালে জমে থাকা অন্ধকার" মাসিক নব জ্যোতি পরিবারে বার্তা সম্পাদক হিসেবে শাহাদাত হোসেনকে স্বাগতম: কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদে আলোচনার কেন্দ্রে নুরুল আলম সিকদার: শতভাগ পাস করা শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিল আল ফালাহ্ ফরায়েজিয়া দাখিল মাদ্রাসাঃ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও পৌর ছাত্রদলের নতুন কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ মিছিল বসুরহাটে শাহজালাল মার্কেটে আগুন,আহত ২ ক্ষয়ক্ষতি দেড় কোটি টাকাঃ কোম্পানীগঞ্জে মাদকবিরোধী র‍্যালি ও সমাবেশ অনুষ্ঠিতঃ

"কোম্পানীগঞ্জের সম্ভাবনার আড়ালে জমে থাকা অন্ধকার"

"কোম্পানীগঞ্জের সম্ভাবনার আড়ালে জমে থাকা অন্ধকার"

"কোম্পানীগঞ্জের সম্ভাবনার আড়ালে জমে থাকা অন্ধকার"

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রকৃতি, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে সমৃদ্ধ এক জনপদ। সম্ভাবনার বিচারে এ উপজেলা পিছিয়ে থাকার কথা নয়। কিন্তু উন্নয়ন ও সম্ভাবনার দৃশ্যমান চিত্রের আড়ালে গত কয়েক বছরে এমন কিছু সংকট জমা হয়েছে, যেগুলোকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক বিভাজন, দখল-দূষণ, জলাবদ্ধতা, বেকারত্ব, মাদক, যানজট ও নাগরিক দুর্ভোগ সব মিলিয়ে কোম্পানীগঞ্জের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, উন্নয়নের হিসাব যখন করা হয়, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, স্বস্তি ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার হিসাবটি কোথায়?নিরাপত্তাহীনতার ছায়া "কোম্পানীগঞ্জের" সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তা।

জমি-জমা, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব অনেক সময় সংঘাতের রূপ নেয়। কোথাও হামলা, কোথাও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, কোথাও আবার প্রভাবশালীদের আধিপত্য এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

একটি জনপদে যদি মানুষ মনে করেন, আইনের চেয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব বেশি কার্যকর, তাহলে সেখানে উন্নয়নের দৃশ্যমান অর্জনও আস্থার সংকট কাটাতে পারে না।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই জায়গায় কোনো দুর্বলতা থাকলে অন্য সব অর্জনই প্রশ্নের মুখে পড়ে।"রাজনীতি হোক মানুষের জন্য রাজনীতি গণতন্ত্রের প্রাণ।"

কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্য যখন প্রতিহিংসা, আধিপত্য ও সংঘাতের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ।ব্যবসায়ীকে ব্যবসা করতে হয়, কৃষককে মাঠে যেতে হয়, শিক্ষার্থীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়, চাকরিজীবীকে কর্মস্থলে যেতে হয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা তাই শুধু রাজনীতির মাঠে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সম্পর্কের ওপরও।কোম্পানীগঞ্জের রাজনীতির প্রয়োজন সংঘাতের নয়, প্রতিযোগিতার; প্রতিহিংসার নয়, মতের; আধিপত্যের নয়, জনস্বার্থের।"নদী-খাল বাঁচলে বাঁচবে জনপদজলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সংকট"

কোম্পানীগঞ্জের জন্য নতুন কোনো সমস্যা নয়। নদী-খাল দখল, পানি নিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা বর্ষাকালে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়। উপকূলীয় অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততার ঝুঁকিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।প্রশ্ন হলো,নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে না এনে কেবল সাময়িক প্রকল্প বা পানি অপসারণের উদ্যোগ দিয়ে কতদিন এই সংকট সামাল দেওয়া যাবে?

জলাবদ্ধতা নিরসনে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। খাল উদ্ধার, নিয়মিত খনন, দখলমুক্তকরণ, কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ সবকিছুকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। প্রকৃতিকে অবরুদ্ধ করে উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।

বাজারে ব্যবসা, নাকি ঝুঁকি?বসুরহাটসহ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলো স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু যানজট, অপরিকল্পিত দোকানপাট, ফুটপাত দখল, অগ্নিনিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থার ঘাটতি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।একটি অগ্নিকাণ্ড শুধু কয়েকটি দোকান পুড়িয়ে দেয় না; এর সঙ্গে পুড়ে যায় বহু পরিবারের সঞ্চয়, স্বপ্ন ও জীবিকার ভিত্তি। তাই বাজার ব্যবস্থাপনা কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয় এটি জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।তরুণদের ভবিষ্যৎ কোথায়?কোম্পানীগঞ্জের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। অথচ উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেক তরুণকে কর্মসংস্থানের জন্য উপজেলা ছাড়তে হয়।

স্থানীয়ভাবে শিল্প, বিনিয়োগ ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় প্রবাস কিংবা শহরমুখী হওয়াই অনেকের কাছে একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়।এভাবে একটি এলাকার মেধাবী ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যদি নিয়মিত বাইরে চলে যায়, তাহলে স্থানীয় অর্থনীতির ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বেই।কোম্পানীগঞ্জে ছোট ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবেও দেখতে হবে।মাদক প্রতিরোধে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়মাদক ও কিশোর অপরাধের ঝুঁকি একটি সমাজের ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।তরুণদের জন্য খেলাধুলার মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।একজন তরুণ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর তাকে সংশোধনের চেষ্টা করার চেয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই তার সামনে বিকল্প ভবিষ্যৎ তৈরি করা অনেক বেশি কার্যকর।

প্রশ্ন একটাই পরিবর্তনটা কোথায়?সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, এসব সমস্যার অনেকগুলোই নতুন নয়। বছরের পর বছর আলোচনা হয়েছে, সভা হয়েছে, প্রকল্প এসেছে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থেকেই গেছে পরিবর্তনটা কোথায়?কোম্পানীগঞ্জের মানুষ উন্নয়ন চান।

তবে তারা শুধু কাগজে-কলমে উন্নয়নের হিসাব চান না। তারা চান নিরাপদ জীবন, স্বচ্ছ প্রশাসন, যানজটমুক্ত বাজার, জলাবদ্ধতামুক্ত বসতি, কর্মসংস্থান এবং আইনের সমান প্রয়োগ।উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই তৈরি হয়, যখন তার সুফল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অনুভূত হয়।কোম্পানীগঞ্জকে শুধু রাজনৈতিক সাফল্য, সড়ক নির্মাণ কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নের সংখ্যায় বিচার করলে বাস্তব চিত্রের একটি অংশই দেখা হবে।

প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত একজন সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন, একজন তরুণ নিজের এলাকায় কতটা আশাবাদ নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন, একজন ব্যবসায়ী কতটা নিশ্চিন্তে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন এবং একজন নাগরিক কতটা মর্যাদা ও স্বস্তির সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।

কোম্পানীগঞ্জের সমস্যা অস্বীকার করলে সংকট আরও গভীর হবে। প্রয়োজন সমস্যাগুলোকে রাজনৈতিক চশমায় নয়, বাস্তবতার চোখে দেখা। প্রয়োজন অভিযোগের রাজনীতির বাইরে গিয়ে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলা।কারণ একটি উপজেলার ভবিষ্যৎ কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের হাতে নয়। সেই ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সুশাসন, আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর।

কোম্পানীগঞ্জের সম্ভাবনা অনেক। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনার ওপর জমে থাকা অন্ধকার সরিয়ে দেওয়ার সাহস, সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ।

শাহাদাত হোসেন

গণমাধ্যমকর্মী।

সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা (পিআইবি)।

Comments (0)

Be the first to comment on this article.


Leave a comment

Your comment will be reviewed before publication.