মানুষ ও সৃষ্টির মননে উচ্ছ্বাস বোনা এক আরাধ্য ঋতুর নাম ঋতুরাজ শরৎ
ঋতু যায়, ঋতু আসে সময়ের ভেলায় ভেসে। মহাকাল পরিক্রমা করে প্রতিটি ঋতু ফিরে আসে এক একটি শৈল্পিক বৈচিত্র্য ও নতুনত্বের আমেজ নিয়ে।
প্রকৃতির লাস্যময়ী রূপের মাঝে তারা নিবেদন করে সৌন্দর্যের অপার সম্ভার।
আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশসহ বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে বছরের ছয় ঋতু বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
জীবনের নিগূঢ় বাস্তবতার খড়্গ সামলাতে গিয়ে মানুষ যখন কর্মব্যস্ততার মোহচক্রে গুম হয়ে যায়, তখন প্রকৃতির এই ঋতুবৈচিত্র্য মানুষের জীবনে এনে দেয় স্বস্তি, প্রশান্তি ও নতুন অনুভূতির পরশ।
মানুষ ও প্রকৃতির জীবনচরিত্রে ছয় ঋতু অনিঃশেষ প্রভাব বিস্তার করে,এটি এক অনিবার্য সত্য। বিশেষ করে মানুষের জীবনাচার, রুচি, ভাবনা, দর্শন, মানসিকতা ও প্রশান্তির অনুভূতিতে এই ছয় ঋতু বৈচিত্র্যময় প্রভাব সৃষ্টি করে।
মানুষের অর্থনীতি, সমাজনীতি ও সংস্কৃতিতেও ছয় ঋতু পালন করে অগ্রণী ভূমিকা।
কালের নিয়মে একের পর এক ঋতুর আগমনের বার্তায় মানুষ ও প্রকৃতি অপেক্ষা করে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ গ্রহণের জন্য।
এই তো গেল বর্ষা ঝুমঝুম বৃষ্টির ঢাকঢোল বাজিয়ে সময়ের ভেলায় প্রকৃতির মঞ্চ থেকে বিদায় নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ঋতুরাজ শরৎকে করে গেল স্বাগত।
অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মানুষ ও সৃষ্টির কলেবরে অবতরণ করল ঋতুরাজ শরৎ। ঋতুরাজ বা শরৎরানী
যে নামেই ডাকি না কেন, মহান স্রষ্টার সৃষ্টির এক অপূর্ব ও অভূতপূর্ব ঋতু হলো শরৎ।
শরৎ শুধু মানুষের মনে হৃদস্পন্দন জাগায় না,বরং সকল প্রাণী ও প্রকৃতির মননে সহজাত বৈশিষ্ট্যের এক ভিন্নমাত্রিক অনুভূতি ও উচ্ছ্বাসেরও সৃষ্টি করে।
বর্ষার ক্লান্তিহীন রিমঝিম বৃষ্টির বিদায়ী ধ্বনি শেষ হতেই শরৎ তার দুই সহোদর ভাদ্র ও আশ্বিনকে নিয়ে হাজির হয়।
প্রকৃতির বুকে সৃষ্টি করে এক নিখাদ, শান্ত, শীতল ও প্রাণবন্ত আমেজ। অনাদিকাল থেকেই শরতের সঙ্গে মাতৃকার মাটি ও মানুষের এক নিবিড় ও প্রাণবন্ত রসায়ন রয়েছে।
প্রকৃতির সকল প্রাণোচ্ছ্বাসে এক সরল, নির্মল ও স্নিগ্ধ আবহ তৈরি করে এই শরৎ।
শরতের প্রতিটি ভোর দিনের আবরণে প্রবেশ করে ভিন্ন ভিন্ন রূপে, বহুমাত্রিক সাজে। সজ্জিত করে মানুষ ও প্রকৃতির অন্তরাত্মা। কখনো কখনো সবুজ ঘাসের ডগায় ডগায় জমে থাকা শিশিরের বিন্দু মণিমুক্তোর মতো চিকচিক করে।
পুব আকাশের উদিত সূর্যের রশ্মি তার পরিচয় প্রকাশ করে।
আবার কখনো কখনো ঝিরঝির বাতাসের ফাঁক গলে নামে খানিক বৃষ্টির শান্ত জলধারা।
পল্লবিত হয় পত্রশাখা, কুসুমিত হয় বাহারি রকমের ফুল। গাছের পাতাবাহার দোল খায় হিমশীতল বাতাসের খুনসুটিতে। পাখিদের রকমারি কলকাকলিতে জেগে ওঠে ভোরের চোখ।
পথচলা সড়কের দু’ধারে শিউলি ফুলের আয়েশি দোল তৈরি করে যেন সাদা গালিচার চাদর। তা মানবাত্মায় সঞ্চার করে নবোদ্যম ও কর্মস্পৃহা। ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠ সবুজাভ এক মানচিত্রের আকার ধারণ করে।
দিনের কর্মযজ্ঞে কখনো বৃষ্টির শান্ত ধারা, আবার কখনো কাঁচা রোদের প্রলেপ প্রকৃতি ও মানুষের অন্তরের অন্তরালে সৃষ্টি করে এক বৈচিত্র্যময় প্রশান্তির আমেজ।
শরতের গন্ধে শিউলি, শাপলা, জারুল, জুঁই, জবা, কামিনী, মালতী আর কাশফুলের চাদর দুলতে থাকে তৃপ্তির আমেজে। ভোরের শরীরে শীতের হালকা পরশ, শিউলি ও কাশফুলের আয়েশি সৌন্দর্য শরৎকে তুলে ধরে এক ভিন্ন পরিচয়ে।
নদীর দু’ধার, বিল-ঝিলে ফোটে কাশফুল। আয়েশি ঢঙে দোল খায় তারা যেন আকাশপাড়ে সাদা মেঘের পায়চারি। নির্মল আকাশ থাকে নীলের আবেশে, শান্ত মেজাজে। কখনো কখনো মেঘের খণ্ড এসে বিশাল আকাশের দেহে পরিয়ে দেয় সাদা চাদর।
দিনের কর্মযজ্ঞে গরম রোদের প্রলেপ থাকলেও রাতের মেরুদণ্ডে আনাগোনা করে হিমশীতল বাতাস। অনুভূত হয় শান্ত শীতের এক নাতিশীতোষ্ণ আবহ।
নদী-খাল-বিল-ঝিলে স্বচ্ছ পানি থাকে শান্ত মেজাজে। শাপলা ফুলের বিছানায় সুসজ্জিত হয়ে ওঠে প্রকৃতির চারপাশ।
দিন-রাত সমানুপাতিক সময়ের ধারায় চলে সমানতালে।
এ সময় গাছের পাতায় পাতায় রঙের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায়। হলুদ, বাদামি ও কমলা রঙে সেজে প্রকৃতি পরিশেষে নীরবে তার পুরোনো সাজকে বিদায় জানায়।
কৃষকের ধানের ফসল পেকে উঠোন ভরার উপযুক্ত সময় এসে পড়ে। তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষমাণ কৃষাণের মন ফিরে পায় স্বস্তির ভাঁজ।
জেগে ওঠে প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস। মাঠজুড়ে দুলতে থাকা পাকা ধানের শীষ যেন কৃষকের স্বপ্ন, শ্রম ও প্রত্যাশার সার্থকতার বার্তা বহন করে।
তাই ঋতুরাজ শরৎ মানুষ ও সৃষ্টির মননে উচ্ছ্বাস বোনা এক আরাধ্য ঋতু। নবউদ্যমে জেগে ওঠা মানুষ ও প্রকৃতির ঋতু ঋতুরাজ শরৎ।
মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন
কবি, শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক
Best Regards
Mohammad Kutubuddin
CEO, Skymode International
Poet, Editor & Writer
Chief Advisor, Novo Joti News
Founder, National Writers Council
Central Member, Nationalist Writers Forum
Corporate Office: J-126, Rowshan Villa, Gulshan-Link Road, Dhaka-1212, Bangladesh
Cell: +8801798595925
Email: ops.skymode2009@gmail.com
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment