"মন্দ আখলাক রিযিক কমিয়ে দেয়"
মাও. ইয়াছিন ফয়েজ আল-উসমানী
প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক: মাদরাসাতুল হিকমাহ লাকসাম, কুমিল্লা।
মানুষ সাধারণত রিযিক বলতে টাকা-পয়সা, চাকরি, ব্যবসা, পদ-পদবি এই দৃশ্যমান বিষয়গুলোকেই বোঝে। অথচ ইসলামি দৃষ্টিতে রিযিকের পরিসর অনেক বিস্তৃত। উত্তম জীবনসঙ্গী, সম্মান, মানুষের ভালোবাসা, সুযোগ, সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি সবই রিযিকের অন্তর্ভুক্ত।
আর এই বিস্তৃত রিযিকের সঙ্গে মানুষের আখলাকের সম্পর্ক যে কতটা গভীর, তা আমরা বেশির ভাগ সময়ই বুঝে উঠতে পারি না।আখলাকের পরকালীন গুরুত্ব তো বর্ণনাতীত, এ কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।কুরআন ও হাদিসে উত্তম আখলাকের ফজিলত
এত বেশি এসেছে যে, একজন মুমিনের ইবাদতের ওজন অনেক সময় তার আখলাক দিয়েই মাপা হয়। কিন্তু আখলাকের দুনিয়াবি প্রভাব ও ফলাফল এই জায়গাটিতে আমরা মারাত্মকভাবে উদাসীন।
বিয়ের ময়দানে আখলাকের নীরব বিচার বর্তমান অনলাইন-অফলাইন বাস্তবতায়,বিয়ের প্রস্তাব একটি নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে,বিয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় এমন একটি বিষয়, যা মুখে খুব কমই উচ্চারিত হয় তা হলো ব্যক্তিগত দ্বীনদারিতা ও আখলাক।
অসংখ্য বার এমন হয়েছে অমুক ভাই বা তমুক বোনের ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে। কখনো নিজের সার্কেল থেকে, কখনো পরিচিত কোনো বিশ্বস্ত সার্কেল থেকে খোঁজ নিয়ে জানাতে হয়েছে। যাদের কাছে
খোঁজ নেওয়া হয়, তারা সাধারণত সেই মানুষটিকে কাছ থেকে চেনে,একসঙ্গে পড়েছে, কাজ করেছে, থেকেছে, চলাফেরা দেখেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্যণীয় এই খোঁজখবর ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের জগৎ
থেকে নেওয়া হয় না। ফেসবুকের পোস্ট, স্টোরি বা অনলাইন ধর্মীয় কথাবার্তা দিয়ে আখলাকের বিচার হয় না।বিচার হয় বাস্তব জীবনের আচরণ দিয়ে।
এটা কোনো গুপ্তচরবৃত্তি নয়। বরং এটিই ইসলামের
নির্দেশিত পদ্ধতি। বিয়ের ক্ষেত্রে যাচাই করা সুন্নাহ। কারণ একটি পরিবার,একটি জীবন, একটি ভবিষ্যৎ
এই সবকিছুর সঙ্গে আখলাক সরাসরি জড়িত।
এর মানে কী দাঁড়ায়। আপনি নিজেও জানেন না
কোন পথ দিয়ে, কোন মানুষ হয়ে, আপনার আখলাকের রিপোর্ট কোথায় পৌঁছে যাচ্ছে। হয়তো আপনার অজান্তেই আপনার চরিত্রের ফাইল কারও
হাতে পৌঁছে গেছে, যার সঙ্গে আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় জড়িয়ে আছে।বাহ্যিক
দ্বীনদারিতা বনাম বাস্তব আখলাক একটি বাস্তব
ঘটনা এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।আমাদের ব্যাচেরই এক ছেলে হঠাৎ করেই দ্বীনের পথে এসেছে।পোশাকে আমূল পরিবর্তন। ইয়ো ইয়ো কালচার থেকে একেবারে জোব্বা, দাড়ি, টুপি। এমন পরিবর্তন নিঃসন্দেহে ভালো লাগার মতো। আমরা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেই এই মানুষটি নিশ্চয়ই ভেতর থেকেও বদলাচ্ছে।
কিন্তু সে যে ওয়ার্ডে ডিউটি করতো, সেখানে আমাদের আরও কিছু পরিচিত ছিল। এমন সময় এক দ্বীনি জুনিয়র নক দিয়ে জানালো এই ছেলেটার দ্বীনদারিতা
ও আখলাক সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে। বিয়ের কথা চলছে। বাহ্যিক লেবাস ও দৃশ্যমান পরিবর্তনের কারণে দ্বীনদারিতার বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করাই স্বাভাবিক
ছিল। কিন্তু আখলাক যাচাই করতে গিয়ে তার
কর্মস্থলের সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে হলো। সেখান থেকে একাধিক সূত্রে জানা গেল,লেবাস বদলালেও ব্যবহার ও আখলাক নাকি অত্যন্ত খারাপ।
ইসলামের একটি সুস্পষ্ট বিধান হলো বিয়ের ক্ষেত্রে সত্য গোপন করা জায়েজ নয়। ফলে দ্বীনি ভাই হিসেবে তাকে সম্মান করার পরও, পাত্রী পক্ষকে আখলাকের বিষয়ে নেগেটিভ রিভিউ দিতে বাধ্য হতে হলো। ফলাফল সেই বিয়ের আলোচনা সেখানেই শেষ।
সেদিন গভীরভাবে অনুভব করলাম, মানুষ নিজেও জানে না, মন্দ আখলাকের কারণে কত বড় রিযিক তার হাতছাড়া হয়ে যায়। আর উত্তম জীবনসঙ্গী তো নিঃসন্দেহে দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রিযিক।ক্ষুদ্র
আচরণে বড় রিযিক হারানো এবার একটু সাধারণ জীবনের দিকে তাকাই।ধরুন, আপনি রিকশায় উঠেছেন। রিকশাওয়ালার অবস্থা দেখে আপনার মনে মায়া হলো। ভাবলেন নামার সময় ৫–১০ টাকা বেশি
ভাড়া দেবেন। কিন্তু নামানোর আগেই সে আপনার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করলো, অন্যায্য ভাড়া দাবি করলো, ঝগড়ায় জড়াতে চাইলো।আপনি বিরক্ত হয়ে শুধু
পাওনাটা দিয়ে দ্রুত সরে গেলেন।অথচ বাস্তবে সে আরও বেশি পাওয়ার যোগ্য ছিল শুধু মন্দ আখলাকের
কারণেই সেই অতিরিক্ত রিযিক সে হারালো।এই ঘটনা প্রতিদিন আমাদের চারপাশে ঘটছে। আমরা দেখি, কিন্তু শিক্ষা নেই না।কোন আচরণ কোন দরজা বন্ধ
করে দেয়। আমরা জানি না আমরা নিজেরাও জানি না কোন মানুষের সঙ্গে করা কোন আচরণ কোন দিক দিয়ে আমাদের তাক্বদীরের প্রবাহে প্রভাব ফেলছে।হয়তো রিকশাওয়ালার সঙ্গে,ঘরের খাদেমার সঙ্গে,
সহকর্মী বা রুমমেটের সঙ্গে,প্রতিবেশীর সঙ্গে
আমাদের একটি কটু কথা, একটি তাচ্ছিল্য, একটি অহংকারী আচরণ কোথাও গিয়ে আমাদের জন্য একটি দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।আমরা জানি না সেই
রিপোর্ট কার মাধ্যমে, কোন লিংকে, কার কাছে পৌঁছে গেছে। হয়তো এমন কারও কাছে, যার হাতে ছিল আমাদের কোনো সম্মান, সুযোগ বা সম্ভাব্য রিযিক।
দুনিয়ার হিসাব এখানেই শেষ নয় এই সবই দুনিয়াবি হিসাব।কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টি,কিরামুন কাতিবীনের দফতর?সেখানে তো একটি হাসিও লেখা হয়,
একটি কটু কথাও লেখা হয়,একটি অবহেলাও বাদ যায় না।মানুষকে হয়তো ম্যানেজ করা যায়, কিন্তু তাক্বদীরের প্রবাহে মন্দ আখলাকের ক্ষতি এড়িয়ে
যাওয়া যায় না।মন্দ আখলাক শুধু সম্পর্ক নষ্ট করে না এটা নীরবে রিযিক কমিয়ে দেয়।আর উত্তম আখলাক নীরবে এমন সব দরজা খুলে দেয়, যার কথা মানুষ কল্পনাও করে না।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment