পরিবর্তনের পক্ষে, পরিবর্তনের লক্ষ্যে
মুঃইব্রাহীম খলিল জসিম
জনতার হাতে ক্ষমতা ও সুশাসনের বাংলাদেশ,
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্ণ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ এক গভীর ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপনীত। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন এই দেশটির মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং শোষণমুক্ত সমাজ গঠন করা, যেখানে সাধারণ মানুষ হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক। কিন্তু দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশকেও সেই স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে জনগণের ভোটাধিকার, আইনের শাসন এবং সুশাসনের প্রত্যাশা।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ সমগ্র জাতির একটাই প্রাণের দাবি—"পরিবর্তনের পক্ষে, পরিবর্তনের লক্ষ্যে, ক্ষমতা যাবে জনতার কাছে।"
স্বাধীনতার ৫৫ বছর ও সুশাসনের সংকট
একটি স্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময় শাসনক্ষমতা পরিবর্তনের পালাবদল ঘটলেও জনজীবনের প্রকৃত মুক্তি আসেনি। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার পরিবর্তন এলেও কাঠামোগত সংস্কারের অভাবে আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচনব্যবস্থা বারবার রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হয়েছে।
সুশাসনের অনুপস্থিতির কারণে সমাজে তৈরি হয়েছে এক বিরাট বৈষম্য। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থপাচার এবং জবাবদিহিহীন সংস্কৃতি দেশের উন্নয়নকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। সাধারণ মানুষ খেটে খাওয়া ঘামে দেশ চালালেও রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে তাদের কোনো কার্যকর ভূমিকা থাকে না। ফলে নাগরিক অধিকার সংকুচিত হয়েছে এবং সুশাসন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
সৎ ও ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্বের অভাব
বর্তমান জাতীয় সংকটের মূলে রয়েছে এক গভীর নেতৃত্ব সংকট। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যিনি লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দেবেন। কিন্তু বারবার দেখা গেছে, নীতি নৈতিকতা ও আদর্শের চেয়ে দলীয় স্বার্থ এবং ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে উঠেছে।
সৎ ও ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্বের অভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ভেঙে পড়েছে রাজনীতি ও রাজনীতিকদের ওপর। একজন সৎ নেতা কেবল আইনের শাসনই প্রতিষ্ঠা করেন না, বরং জনগণের মাঝে আশার আলো জাগিয়ে তোলেন। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে বড় আকৃতি হলো এমন দূরদর্শী ও সত্যানুরাগী নেতৃত্ব, যারা ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে প্রকৃত সেবক হিসেবে কাজ করতে প্রস্তুত।
ক্ষমতার প্রকৃত উৎস,জনতা
গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো—"জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস"। কিন্তু গত কয়েক দশকে এই প্রবাদটি প্রায়শই স্লোগানে পরিণত হয়েছে, বাস্তবে রূপ পায়নি। ক্ষমতার চাবিকাঠি যখন গুটিকয়েক মানুষের হাতে বা সিন্ডিকেটের কবজায় চলে যায়, তখন গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে।
প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ সমাজ, প্রান্তিক কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে।
পরিবর্তনের পক্ষে ও লক্ষ্যের রূপরেখা
আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমাদের কাঠামোগত ও মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন। এই পরিবর্তনের রূপরেখা হতে পারে নিম্নরূপ,
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: রাষ্ট্রীয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে।
মেধাবীদের মূল্যায়ন: দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে মেধা, যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পদে দায়িত্ব প্রদান।
স্বাধীন বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যম: গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যম এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
যুবসমাজ ও তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ: দেশের চালিকাশক্তি তরুণ সমাজকে গঠনমূলক কাজে সম্পৃক্ত করা এবং তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন করা।
৫৫ বছরের বঞ্চনা ও সংকটের অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এখন সময়ের দাবি। আমাদের তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষ আজ জেগে উঠেছে এক নতুন পরিবর্তনের প্রত্যয়ে। এই পরিবর্তন কেবল মুখের বুলি নয়, এটি হতে হবে কাঠামোগত ও নৈতিক।
সৎ, যোগ্য এবং ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্বের হাত ধরে যখন ক্ষমতা প্রকৃত অর্থেই সাধারণ জনতার হাতে ফিরে যাবে, তখনই রচিত হবে এক সত্যিকারের সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ।
"পরিবর্তন আসবেই, আর সেই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হতে হবে—জনগণের অধিকার ও ক্ষমতার পূর্ণ প্রতিষ্ঠা।"
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment