বাংলা কবিতার একাল ও সেকাল
মুঃইব্রাহীম খলিল জসিম
বাংলা কবিতা আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন। আবহমানকাল থেকেই মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিদ্রোহ এবং অস্তিত্বের গভীর উপলব্ধি প্রকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো কবিতা। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে কবিতার রূপ, ভাষা এবং প্রকাশ ভঙ্গিতে এসেছে নানা পরিবর্তন।
কবিতা মানুষের মনের কথা বলে, অল্প কথায় মনের ভাব প্রকাশের এক শিল্পিত মাধ্যম হলো কবিতা। এটি মানুষের মনের খোরাক জোগায়। মানুষ হয়তো অনেক সময় গল্প, উপন্যাস বা নাটক না পড়লেও মনের টানে কবিতা পড়ে। কারণ, কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে মানুষের জীবনের না বলা কথা, আবেগ ও অনুভূতির প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসে কবিতার ধারা বহমান, যার আদি রূপ থেকে বর্তমান রূপ এক দীর্ঘ বিবর্তনের পথ পরিক্রমা।
কবিতা হলো ছন্দ, সুর এবং ভাবের এমন এক অপূর্ব সমন্বয়, যা অল্প কথায় মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিতে পারে। মানুষের আনন্দ, বেদনা, বিরহ, দ্রোহ ও প্রেমের প্রকাশ ঘটাতে কবিতার জুড়ি নেই। মানবসভ্যতার সূর্যাস্তের পর থেকেই মানুষ তার আবেগ প্রকাশের জন্য কবিতার আশ্রয় নিয়েছে। এটি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং মননশীলতা ও কল্পনাশক্তির বিকাশ সাধনে কবিতার ভূমিকা অপরিসীম।
বাংলা কবিতার সেকাল: প্রাচীন ও মধ্যযুগ
বাংলা কবিতার ইতিহাস প্রায় হাজার বছরের পুরনো।
প্রাচীন যুগ (চর্যাপদ): বাংলা কবিতার সূর্যাস্ত শুরু হয় চর্যাপদের মাধ্যমে। এগুলো ছিল মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের পদ বা গান। এর ভাষা ছিল প্রাচীন বাংলা এবং এর মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও সাধনার বাণী উঠে এসেছিল।
মধ্যযুগ: মধ্যযুগের বাংলা কবিতা ছিল প্রধানত ধর্মভিত্তিক ও মঙ্গলকাব্য নির্ভর। এ সময় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য (যেমন- মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল), এবং বৈষ্ণব পদাবলী রচিত হয়। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, কৃত্তিবাস ওঝা (রামায়ণ অনুবাদক) এবং কাশীরাম দাসের (মহাভারত অনুবাদক) হাত ধরে মধ্যযুগের কবিতা পুষ্ট হয়েছিল। এছাড়া মধ্যযুগের শেষভাগে এসে মুসলমান কবিদের দ্বারা ইউসুফ-জুলুখা, লায়লী-মজনু ও পুথি সাহিত্যের সূচনা হয়।
বাংলা কবিতার একাল: আধুনিক যুগ
আধুনিক যুগের সূচনা হয় উনবিংশ শতাব্দীতে, যার পুরোধা ছিলেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি বাংলা কবিতায় প্রবর্তন করেন অমিত্রাক্ষর ছন্দ এবং সনেট। এরপর বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক নতুন সূর্য নিয়ে আসেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর হাত ধরে বাংলা কবিতা নতুন মাত্রা, সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য লাভ করে।
রবীন্দ্র-পরবর্তী ও আধুনিক যুগ: রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা কবিতায় আধুনিকতার হাওয়া বইয়ে দেন কাজী নজরুল ইসলাম (যিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত), জীবনানন্দ দাশ (রূপসী বাংলার কবি), সুকান্ত ভট্টাচার্য, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ। এ সময় কবিতার বিষয়বস্তু কেবল রোমান্টিকতা বা প্রকৃতির মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এতে যুক্ত হয় মানুষের অধিকার, রাজনৈতিক দ্রোহ, নগর জীবনের যান্ত্রিকতা, হতাশা এবং অস্তিত্বের সংকট।
সাম্প্রতিক কাল: একালের কবিতায় বিষয় ও প্রকরণে এসেছে বহুমাত্রিকতা। গদ্যছন্দের বহুল ব্যবহার, প্রতীকধর্মিতা এবং জীবনের নানা জটিলতা আধুনিক কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেকাল ও একালের কবিতার মধ্যে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য লক্ষণীয়:
ভাষা ও রূপ: সেকালের কবিতা প্রধানত পদ্য বা ছান্দসিক রূপ এবং অলংকারে সমৃদ্ধ ছিল। পক্ষান্তরে, একালের কবিতা মুক্তক বা গদ্যছন্দে বেশি রচিত হয়।
বিষয়বস্তু: সেকালের কবিতায় দেব-দেবী, পুরাণ বা আধ্যাত্মিকতার প্রভাব বেশি ছিল। একালের কবিতায় স্থান পায় মানুষ, সমাজ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সমসাময়িক বাস্তবতার দ্বন্দ্ব।
উদ্দেশ্য: সেকালের কবিতা মূলত ছিল আখ্যানমূলক বা স্তুতিমূলক। একালের কবিতা আত্মিক অনুসন্ধান ও মননশীলতার খোরাক জোগাতে বেশি সচেষ্ট।
বাংলা কবিতা কালের স্রোতে তার রূপ বদলালেও তার অন্তর্নিহিত আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। সেকালের লৌকিক ও অলৌকিক চেতনা থেকে শুরু করে একালের আধুনিক মনস্তত্ত্ব—সব মিলিয়ে বাংলা কবিতা মানবজীবনের বিশ্বস্ত দর্পণ। মানুষ যতদিন ভাববে, ভালোবাসবে এবং অনুভূতি প্রকাশ করতে চাইবে, ততদিন কবিতা বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment