শিষ্টাচার,সার্টিফিকেট নয়, মানুষের আসল পরিচয়
মুঃইব্রাহীম খলিল জসিম
আজকের প্রতিযোগিতামূলক যুগে আমরা সন্তানকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বড় কর্মকর্তা বানানোর ইঁদুরদৌড়ে ব্যস্ত। সার্টিফিকেট অর্জনের এই মিছিলে আমরা পেছনে ফেলে আসছি সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটিকে,যার নাম শিষ্টাচার। কিতাবি বা পাঠ্য বিদ্যা মানুষকে জীবিকা নির্বাহের পথ দেখাতে পারে, কিন্তু পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব একমাত্র পরিবারের।
শিষ্টাচার কোনো দামি বস্তু নয়, এর জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন হয় না,কেবল প্রয়োজন একটু সদিচ্ছা ও পারিবারিক অনুশাসনের। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে শিষ্টাচারগুলো আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর কয়েকটি নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়া যাক,
খাবারের টেবিলে পারস্পরিক সৌহার্দ্য: যৌথ পরিবারের বা একসাথে খাওয়ার টেবিলে বড়দের আগে নিজের খাওয়া শেষ করে উঠে যাওয়া এক ধরনের অভদ্রতা। সবার খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত টেবিলে সময় দেওয়া এবং প্রয়োজনে সম্মানের সাথে অনুমতি নিয়ে ওঠা পারস্পরিক ভালোবাসাকে বাড়িয়ে দেয়।
বসার ও সম্মানের জায়গা: কোনো অনুষ্ঠানে বা বসার ঘরে বয়োজ্যেষ্ঠরা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নিজে আগে গিয়ে আসনে বসে পড়া ব্যক্তিত্বের ঘাটতি প্রকাশ করে। আগে আপনি বসুন, এই ছোট বাক্যটি বা নিজের আসনটি বড়দের ছেড়ে দেওয়া মানুষের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেয়।
কথোপকথনে সংযম: অন্যের ব্যক্তিগত বা ঘরোয়া বিষয়ে হঠাৎ নাক গলানো কিংবা গুরুজনদের কথার মাঝে হুট করে কথা বলা অনুচিত। কাউকে ডাকার সময় 'এই' বা 'তোরা' না বলে সম্মানজনক সম্বোধন করা এবং টেলিফোনে কথা শেষে শালীনতার সাথে ফোন রাখা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হওয়া উচিত।
কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশ: যিনি রান্না করেন কিংবা আমাদের সেবা করেন, কাজের শেষে তাকে একটা ছোট্ট প্রশংসাবাক্য বা ধন্যবাদ জানানো রান্নার চেয়েও বড় তৃপ্তি দেয়। অহেতুক খাবার নষ্ট না করা এবং শব্দ করে না খাওয়া সুশিক্ষার লক্ষণ।
চলাফেরায় শালীনতা: রাস্তাঘাটে পরিচিত মুরুব্বি বা শিক্ষকদের দেখলে সাইকেল থেকে নেমে একটু মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানানো, হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে অযথা হর্ন না বাজানো এবং লিফট বা দরজায় নারী ও বয়স্কদের আগে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।
শেষ কথা:
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়তো আমাদের সন্তানদের পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর তুলতে শেখাবে, কিন্তু সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার পাঠ কেবল পরিবার থেকেই আসতে পারে। ডিগ্রি হয়তো সাময়িক চাকরি বা অর্থ এনে দেবে, কিন্তু অমায়িক ব্যবহার ও শিষ্টাচার মানুষকে যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখবে। আসুন, সার্টিফিকেট অর্জনের পাশাপাশি সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে আজ থেকেই শিষ্টাচারের শিক্ষা দিই।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment