'শতবর্ষী তাকিয়া জামে মসজিদের নিচ তলায় মার্কেট নির্মানের চেষ্টা'
তাকিয়া জামে মসজিদের নিচতলা ভেঙে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগে ক্ষোভে ফুঁসছে মুসল্লী ও আলেম সমাজ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সাময়িক স্থগিত
তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে বহু :
নব জ্যোতি রিপোর্ট ডেস্ক:
এক শতাব্দীর ইতিহাস, অসংখ্য মুসল্লীর নামাজ, কান্না ও প্রার্থনার সাক্ষী বসুরহাট পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের তাকিয়ার রোডে অবস্থিত তাকিয়া জামে মসজিদ।
রৌশন আলী ভূইঁয়া প্রকাশ(লালুর বাপ)মাজার সংলগ্ন এই মসজিদ শুধু ইট পাথরের স্থাপনা নয়,এটি একটি ঐতিহ্য, একটি বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু।
অথচ সেই পবিত্র স্থাপনাকেই কেন্দ্র করে এখন সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিতর্ক, উত্তেজনা ও সামাজিক দ্বন্দ্ব।
অভিযোগ উঠেছে মসজিদের ওয়াকফকৃত জায়গায়, বিশেষ করে নিচতলা ভেঙে বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণের চেষ্টা চালিয়েছে একটি প্রভাবশালী চক্র।
এতে যুক্ত রয়েছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এবং মসজিদ পরিচালনা কমিটির আংশিক সদস্য। রাতের আঁধারে ভাঙন, নীরব প্রস্তুতি।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৫ জানুয়ারি সোমবার গভীর রাতে ঐ একটি চক্র গোপনে মসজিদের নিচতলা ভাঙার কাজ শুরু করে।
উদ্দেশ্য ছিল নামাজের স্থানকে সরিয়ে সেখানে দোকানপাটের জন্য মার্কেট গড়ে তোলা।রাতের আঁধারে চলতে থাকা এই কর্মকাণ্ড প্রথমে অনেকের চোখ এড়িয়ে গেলেও, মঙ্গলবার সকালে বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, মুসল্লী ও গন্যমান্য ব্যক্তিরা একত্র হয়ে ভাঙনের কাজে বাধা দেন। এ সময় ভাঙনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে সাধারন মানুষ।
আরও অভিযোগ রয়েছে, এ সময় মসজিদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।বারবার ভাঙ্গা প্রতিরোধ চেষ্টা, বারবার প্রতিরোধ করে ও লাভ হয়নি,গত ৭ জানুয়ারি বুধবার রাতেও একই চক্র পুনরায় মসজিদ ভাঙার চেষ্টা চালায়।
তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মুসল্লী ও আলেম সমাজ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে ভাঙনের কাজে বাধা প্রদান করেন। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এরপর বৃহস্পতিবার ৮ জানুয়ারি দুপুরে লাজনাতুল ওলামা কোম্পানীগঞ্জ-এর উদ্যোগে আলেমদের একটি প্রতিনিধি দল কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
অভিযোগে বলা হয়, ওয়াকফকৃত মসজিদের জায়গায় ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী মার্কেট বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়,দোকান ভাড়া দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা আগাম নিয়ে মসজিদ পরিচালনা কমিটির একটি কুচক্রী মহল এই সিদ্ধান্ত নেয়।
স্থানীয়রা জানান, এটি নিছক উন্নয়ন নয়, বরং ধর্মীয় সম্পত্তিকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরের অপচেষ্টা।
স্থানীয়দের বাধার মুখে একপর্যায়ে ভাঙনের কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হলেও, বিষয়টি ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এ মসজিদ ভাঙ্গার বিষয়ে মসজিদ পরিচালনা কমিটি এক সদস্য বলেন, উপদেষ্টা ও মুসল্লীদের পরামর্শে তারা নিচতলায় মার্কেট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
তবে যেহেতু অভিযোগ উঠেছে, তাই আপাতত কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাসুদুর রহমান বলেন,মসজিদের নিচতলা ভেঙে মার্কেট করার বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি।
ইসলামী ফাউন্ডেশনের দায়িত্বশীলসহ উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে আলোচনার মাধ্যমে একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সমাধান করা হবে।
৯ জানুয়ারি শুক্রবার সাধারণ মুসল্লী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনগণ একত্র হয়ে মসজিদের নিচতলায় জুমার নামাজ আদায় করেন।একটি নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিবাদ হিসেবে।
জুমার খুতবার আগে মসজিদের ইমাম সাহেব স্পষ্ট ভাষায় প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন,আমার নাম ব্যবহার করে মিথ্যা ফতোয়া দেওয়া হয়েছে। আমি জানতামই না। মসজিদের উন্নয়নের নামে নিচতলাকে পুরোপুরি মার্কেট বানানোর চেষ্টা ইসলাম ও শরিয়তের পরিপন্থী।
নামাজ শেষে শান্তিপ্রিয় মুসল্লীরা একসঙ্গে শপথ নেন
“মসজিদ না মার্কেট,মসজিদ, মসজিদ বলে শ্লোগান ও শপথ নেন।
এই উচ্চধ্বনি শুধু প্রতিবাদ নয়, এটি ছিল বিশ্বাসের ঘোষণা।প্রশ্নের মুখে নৈতিকতা তাকিয়া জামে মসজিদের ঘটনা শুধু একটি স্থাপনা নিয়ে বিরোধ নয়, এটি ধর্মীয় মূল্যবোধ, ওয়াকফ আইন, সামাজিক দায়িত্ব ও লোভের সংঘাতের প্রতিচ্ছবি।
উন্নয়নের নামে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিককরণ কতটা গ্রহণযোগ্য সে প্রশ্ন আজ নতুন করে সামনে এসেছে।শতবর্ষী মসজিদ কি কেবল একটি ভবন, নাকি একটি আমানত।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বসুরহাটের মানুষ আর সেই উত্তরেই নির্ধারিত হবে তাকিয়া জামে মসজিদের ভবিষ্যৎ।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment