"যোগ্যতার প্রকৃত পরিচয়"
মোহাম্মদ উল্যা মিরাজ,
শিক্ষক, প্রাবন্ধিক।
সমাজে প্রকৃত যোগ্য মানুষের সংখ্যা হয়তো কখনোই খুব বেশি ছিল না, কিন্তু যোগ্যতার দাবিদারের অভাবও কোনোদিন ছিল না। কেউ উচ্চ ডিগ্রির অহংকারে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন, কেউ অর্থ-বিত্তের প্রাচুর্যে, কেউ আবার পদ-পদবির জৌলুসে নিজের গুরুত্ব মাপতে চান। অথচ সময় বড় নির্মোহ বিচারক। একদিন সে সব বাহ্যিক অলংকার খুলে মানুষকে তার প্রকৃত পরিচয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। তখন আর পরিচয় হয় না উপাধিতে, পরিচয় হয় চরিত্রে; মর্যাদা হয় না ক্ষমতায়, মর্যাদা হয় কর্মে।শিক্ষিত হওয়া তুলনামূলক সহজ, কিন্তু সত্যিকারের মানুষ হওয়া অনেক কঠিন। সনদ অর্জন করা যায়, পদ লাভ করা যায়, সম্পদ গড়ে তোলা যায়, কিন্তু মানবিকতা কেনা যায় না। বিবেক, সততা, সহমর্মিতা এবং নৈতিকতা কোনো প্রতিষ্ঠানের সনদে লেখা থাকে না; এগুলো মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং দায়িত্ববোধে প্রকাশ পায়। তাই যে শিক্ষা মানুষের বিবেককে জাগাতে পারে না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয় না, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা শেখায় না—সে শিক্ষা কেবল অক্ষরজ্ঞান, প্রকৃত আলোকপ্রাপ্তি নয়।আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত মানসিকতা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। যে বিনা প্রশ্নে মাথা নত করে, তাকে ভদ্র বলা হয়। যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তি তুলে ধরে, তাকে অহংকারী বলা হয়। যে প্রতিটি কথায় "জি হুজুর" বলতে পারে, তাকে যোগ্য মনে করা হয়; আর যে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তি ও বিবেকের আশ্রয় নেয়, সে হয়ে যায় অযোগ্য। এটি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়; বরং চিন্তার স্বাধীনতার সংকোচন এবং ব্যক্তিত্বের অবমূল্যায়নের প্রতিচ্ছবি।মেরুদণ্ডকে অপরাধ আর নতজানুকে যোগ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এই প্রবণতা সমাজকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। কারণ যে সমাজে প্রশ্ন করার সাহস হারিয়ে যায়, সেখানে উন্নয়নের পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে। ইতিহাসের প্রতিটি ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে ছিল কিছু মানুষ, যারা প্রচলিত ভুলকে প্রশ্ন করার সাহস দেখিয়েছিলেন। তাই প্রশ্ন করা বিদ্রোহ নয়; প্রশ্ন করা সত্য অনুসন্ধানের একটি অপরিহার্য ধাপ।আরও একটি দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—অনেকেই মানুষের মূল্যায়ন করেন তার ব্যাংক হিসাব, পোশাক, গাড়ি কিংবা আর্থিক অবস্থান দিয়ে। কেউ আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে অনেকের চোখে তার সম্মানও যেন কমে যায়। অথচ সম্পদ মানুষের মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সম্পদের উত্তরাধিকার অনেকেই পেয়েছেন, কিন্তু সম্মান ও মর্যাদার উত্তরাধিকার অর্জন করতে হয়েছে সততা, ত্যাগ, প্রজ্ঞা ও কর্মের মাধ্যমে।সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তখন সৃষ্টি হয়, যখন অযোগ্য মানুষ যোগ্যতার বিচারকের আসনে বসে। তখন মূল্যায়নের মানদণ্ড হয় না সততা, দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা কিংবা প্রজ্ঞা; বরং দেখা হয় কে কতটা তোষামোদ করতে পারে, কে নিজের বিবেককে কত সহজে বিসর্জন দিতে পারে, কে ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার কাছে মাথা নত করতে পারে। এমন পরিবেশে যোগ্য মানুষ সাময়িকভাবে উপেক্ষিত হতে পারেন, কিন্তু তাদের মূল্য কখনোই হারিয়ে যায় না।মুখোশ কিছু সময়ের জন্য সম্মান এনে দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী মর্যাদা এনে দেয় না। মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার চরিত্রে, ব্যবহারে এবং কর্মে। আয়নাকে দোষ দিয়ে যেমন মুখ বদলানো যায় না, তেমনি যোগ্য মানুষকে অযোগ্য বললেই তার যোগ্যতা মুছে যায় না। বরং এতে বিচারকের বিচারবোধই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।যোগ্যতার সবচেয়ে বড় শত্রু অযোগ্যতা নয়; বরং অহংকার। অহংকার মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা দেখতে দেয় না এবং অন্যের গুণকে স্বীকার করতে বাধা দেয়। তাই অহংকারী ব্যক্তি প্রায়ই যোগ্য মানুষের মূল্য অস্বীকার করতে চান। কিন্তু সত্যকে দীর্ঘদিন চাপা রাখা যায় না। সময়ের নিরপেক্ষ আদালতে শেষ পর্যন্ত বাহ্যিক জৌলুস নয়, মানুষের চরিত্র, সততা, প্রজ্ঞা এবং মানবিকতাই টিকে থাকে।আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ার চেষ্টা করি যেখানে পদ নয়, মানুষকে মূল্যায়ন করা হবে তার সততা দিয়ে; সম্পদ নয়, সম্মান নির্ধারিত হবে তার চরিত্র দিয়ে; তোষামোদ নয়, মর্যাদা পাবে যুক্তি ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস। কারণ সভ্য সমাজের প্রকৃত শক্তি ক্ষমতাবান মানুষের সংখ্যায় নয়, বরং সৎ, বিবেকবান এবং যোগ্য মানুষের উপস্থিতিতেই নিহিত।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment